চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল তৈরির সংবেদনশীল প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অতীতে ঘটে যাওয়া প্রায় প্রতিটি ফল জালিয়াতির ঘটনার উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারই অনিয়মের মূল আঁতুড়ঘর। ২০২৩ সালের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় বোর্ডের সাবেক সচিবের সন্তানের ফল পরিবর্তনের বিতর্ক, ২০২৫ সালের মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষণে ৩২টি উত্তরপত্রে অসদুপায়ে বাড়তি নম্বর যোগ করা এবং সবশেষে চলমান ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় লিখিত উত্তরপত্রের প্রকৃত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বিশাল গরমিলের ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব গুরুতর জালিয়াতির পেছনে কেবল মুষ্টিমেয় স্থায়ী কর্মকর্তার গাফিলতিই নয়, বরং প্রায় দেড় দশক ধরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা একদল অস্থায়ী অপারেটরের অবাধ সুযোগ ও প্রবেশাধিকারকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা বোর্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ফল তৈরির মতো অতি সংবেদনশীল কাজের জন্য যেখানে শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ আইটি অবকাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে চট্টগ্রাম বোর্ডে কোনো স্থায়ী ‘সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট’ নেই। এই শূন্যতা পূরণে বছরের পর বছর ধরে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিককে খণ্ডকালীন সহায়তার জন্য ধার করে আনা হয়। অথচ একই ব্যক্তি কুমিল্লা বোর্ডে কোনো জালিয়াতি ছাড়া সফলভাবে ফল তৈরি করলেও চট্টগ্রাম বোর্ডে বারবার কেন কেলেঙ্কারি ঘটছে—এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বোর্ডের কম্পিউটার সেলে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রাথমিক সুরক্ষাই ভেঙে পড়েছে। সেখানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাব এবং কাজের স্পষ্ট সীমারেখা না থাকায় কোনো অঘটন ঘটলেই একজন আরেকজনের ওপর দায় চাপিয়ে সহজেই পার পেয়ে যান।
এই চরম অব্যবস্থাপনার অন্যতম নেপথ্য কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োজিত ১৫ জন অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটরের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি। ২০১০ সালের দিকে তীব্র লোকবল সংকট সামাল দিতে দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরিতে প্রথমে সাতজনকে শুধু ওএমআর শিট স্ক্যান করার জন্য কাজে নেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী তাদের মেয়াদ সাময়িক হওয়ার কথা থাকলেও তারা টানা প্রায় ১৬ বছর ধরে বোর্ডে বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে তাদের বাইরে আরও আটজনকে কেবল পরীক্ষার সময় স্ক্যানিংয়ের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে সম্পৃক্ত করা হয়। বছরের পর বছর এক জায়গায় কাজ করার সুবাদে অস্থায়ী এই কর্মীরা ফলাফল প্রক্রিয়াকরণের অত্যন্ত গোপন ও কারিগরি বিষয়গুলোতে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। ফল তৈরির মূল কোডিং ও সিস্টেমে তাদের কতটা প্রবেশাধিকার বা ‘এক্সেস’ দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে।
পরিসংখ্যানগত দিক থেকে দেখলে চট্টগ্রাম বোর্ডের কম্পিউটার সেলের ভঙ্গুর অবস্থা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। উদাহরণস্বরূপ, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন শিক্ষার্থী। প্রতি শিক্ষার্থীকে ১২টি পত্রে পরীক্ষা দিতে হওয়ায় পরীক্ষার্থীর পরিচিতি অংশ অর্থাৎ ‘ই-টাইপ’ এবং প্রধান পরীক্ষকের পাঠানো নম্বর সংবলিত ‘এইচ-টাইপ’ মিলিয়ে প্রতিটি বিষয়ের জন্য দুটি করে কপি স্ক্যান করতে হয়। সেই হিসাবে সব পরীক্ষার্থীর মিলিয়ে মোট স্ক্যান কপির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৬টি। এই বিশাল অঙ্কের উপাত্ত বা ডেটা প্রক্রিয়াকরণের জন্য বোর্ডে স্থায়ী কর্মকর্তা ছিলেন মাত্র দুজন—একজন প্রোগ্রামার ও একজন সহকারী প্রোগ্রামার। এমনকি পারিবারিক কারণে এবারের পরীক্ষার সময় সহকারী প্রোগ্রামার অনুপস্থিত থাকায় একা প্রোগ্রামারের ওপরই পুরো দায়িত্ব বর্তায়। মাত্র একজন ব্যক্তির পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ ডেটা যাচাই ও প্রসেস করা কার্যত অসম্ভব। এই জনবল সংকটের সুযোগ নিয়েই ফল তৈরির চূড়ান্ত ও গোপন কক্ষে অস্থায়ী অপারেটরদের অবাধ যাতায়াত তৈরি হয়, যা নিরাপত্তার চেইন অব কমান্ডকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেয়।
দায়িত্বের প্রশ্নে বোর্ডের ভেতরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও রয়েছে চরম পরস্পরবিরোধী অবস্থান। কম্পিউটার শাখার প্রধান প্রোগ্রামার দাবি করছেন যে, কুমিল্লা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাই ফল তৈরি করেন এবং তারা কেবল তাঁর দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলেন। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে শাখা প্রধানের লিখিত দায়িত্ব না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে কাজের দায় এড়ানোর চেষ্টাও করছেন তিনি। অন্যদিকে কুমিল্লা বোর্ডের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি কেবল পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে দুই-এক দিনের জন্য পর্যবেক্ষক হিসেবে ধাপগুলো পুনরায় যাচাই করতে যান; চট্টগ্রাম বোর্ডের মূল সিস্টেমে তিনি সরাসরি হাতও দেন না। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রোগ্রামেই ফল তৈরি হয় এবং তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে স্থানীয় প্রোগ্রামারের হাতেই।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, জালিয়াতির মূল কারসাজিটি ঘটে ‘ডি-কোডিং’ বা ফলাফল একত্রীকরণের পূর্ববর্তী ধাপে। সাধারণত একজন পরীক্ষার্থীর নাম-রোল সংবলিত ‘ই-টাইপ’ অংশের সঙ্গে খাতার ভেতরের সংকেতযুক্ত ‘এইচ-টাইপ’ অংশ মিলিয়ে ফলাফল চূড়ান্ত করা হয় ডি-কোডিংয়ের মাধ্যমে। এই চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর পরিচিতি ও প্রাপ্ত নম্বর আগাম মিলিয়ে নেওয়ার প্রযুক্তিগত সুযোগ কেবল প্রোগ্রামারের হাতে থাকা সিকিউরিটি কোডের মাধ্যমেই সম্ভব। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় একটি বাদে প্রায় সবকটি বিষয়ে এক শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে প্রকাশিত ফলে অতিরিক্ত নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার যে প্রমাণ মিলেছে, তা এই গোপন কোড ব্যবহার করেই করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই কোডের অপব্যবহার কিংবা তা কোনো অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার দায় বোর্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
প্রতিবেশী কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে যেখানে আইটি শাখায় সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট, সহকারী প্রোগ্রামার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীসহ প্রায় ১৫ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের মতো বিশাল অঞ্চলে কেবল দুজন কর্মকর্তার ওপর পুরো ব্যবস্থা ছেড়ে দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার চূড়ান্ত রূপ। যদিও সাবেক চেয়ারম্যানের সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে ৪২টি পদে স্থায়ী জনবল নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তবে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী না পাওয়ায় সেই পদগুলো আজও শূন্যই রয়ে গেছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ দ্রুত শূন্যপদ পূরণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, দুর্নীতির যে অদৃশ্য রূপকে রূপক অর্থে ‘কালো বিড়াল’ বলা হয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলটি ঠিক তেমনই একটি স্থায়ী কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পরীক্ষার মেধা ও লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে বন্দি, সেখানে স্থায়ী জনবল নিয়োগ, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং কঠোর ডিজিটাল সুরক্ষাবলয় তৈরি করা না গেলে এই শিক্ষাবোর্ডের ফলের বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।