১) কয়েকদিন আগে একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী মারা গেছেন!
চিকিৎসকরা বলছেন, তিনি ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের কারণে মারা গেছেন।
এই পরীক্ষার্থী আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন—যা তিনি কিংবা তাঁর পরিবার জানত না।
চিকিৎসকদের অভিমত, পরীক্ষার সময় তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপ রক্তে শর্করার মাত্রা আরও বাড়িয়ে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
তাঁর দুঃখজনক মৃত্যুর প্রেক্ষিতে এ লেখা।
২) আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম ১৯৮৩ সালে।
পরীক্ষার মাসখানেক আগে তীব্র ভীতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হতে লাগল, আমি একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারব না। কোনো প্রশ্নই কমন আসবে না।
শেষ পর্যন্ত আর না পেরে মহিউদ্দিন খান স্যারকে ব্যাপারটা বলে ফেললাম।
তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। কড়া শাসনে রাখলেও তাঁর হৃদয়ে ছিল মমতার সমুদ্র।
ভেবেছিলাম অতি বদরাগী স্যার আমার কথা শুনে খেপে গিয়ে কড়া ধমক দেবেন। কিন্তু তিনি মিষ্টি হেসে বললেন, ‘চল হাঁটতে যাই।’
দুজনে রাস্তায় হাঁটছি। মিষ্টি বিকেল।
স্যার হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘পরীক্ষা নিয়ে ভয় পাচ্ছিস, বাদলা বেটা?’
‘গুড। তুই কি জানিস, সব পরীক্ষার্থীই কমবেশি ভয় পাচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এদের অনেকেই ভালো রেজাল্ট করবে, তাই না?’
‘তাহলে তুই ভয় পাচ্ছিস, এটা অস্বাভাবিক না। তুই তো আইনস্টাইন না।’
‘আমার অবশ্য মনে হয় আইনস্টাইনও পরীক্ষা ভয় পেতেন। নইলে জুরিখ
পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে টিকলেন না কেন? এইটা একটা কথা! ভবিষ্যতের মহাবিজ্ঞানী করলেন ফেইল!’
‘স্যার, কিন্তু আমার ভয় তো যাচ্ছে না। কী করব?’
‘পরীক্ষার হলে ভয় লাগলেই বড় দম নিবি, তারপর ছাড়বি। এইটা ভয় কাটায়।’
‘পরীক্ষার আগে জান দিয়া পড়ার দরকার নাই। কমপক্ষে সাত/আট ঘণ্টা ঘুমাবি। ভালো ঘুম ব্রেইনকে রিচার্জ করে, তাই যা পড়বি তা মনে থাকবে।’
‘পোশাক, অ্যাডমিট কার্ড, কলম, ঘড়ি, জ্যামিতি বক্স, জুতা-মোজা সব আগের রাতে ঠিক করে রাখবি। যাতে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়া না হয়। অনেকে এগুলা খুঁজতে গিয়া বিরাট ঝামেলায় পড়ে, হলে পৌঁছাতে দেরি হয়। এইটা খুব খারাপ।’
‘পরীক্ষার দিন গা ডলা দিয়া গোসল করবি। এতে মাইন্ড ফ্রেশ হয়। তোর তো আবার গা-গোসলের অভ্যাস কম। খবরদার, পরীক্ষার দিন গোসল বাদ দিবি না। গায়ে চিকাপঁচা গন্ধ নিয়া পরীক্ষা দিতে গেলে কিন্তু পিটায়া দুরমুজ বানামু।’
‘গুড। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর সব প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে পড়বি। পরীক্ষার প্রশ্ন বোঝাটাও রেজাল্ট ভালো করার অংশ।’
‘সবচেয়ে ভালো যে প্রশ্নের উত্তর জানিস, তা দিয়ে লেখা শুরু করবি। প্রথম উত্তর ভালো হলে দেখবি ভয় কেটে যাচ্ছে। মনে হবে, আরে, আমি তো সব পারি, ভয় কী?’
‘যে বন্ধুরা তোর মতো নার্ভাস, তাদের সঙ্গে পরীক্ষার আগে ভুলেও মিশবি না। যদি মিশিস, তাদের ভয় তোকেও আক্রান্ত করবে। বদসঙ্গ গুণনাশিনী।’
‘বেশি ভয় লাগলে প্রিয় কারো সাথে ব্যাপারটা নিয়া সল্লা করবি। অবশ্য তুই আমাকে বলছস, এইটা ভালো লক্ষণ।’
‘আপনাকে বলতে ভালো লাগে, স্যার।’
‘হাহাহা। এত পিটাইলাম, তারপরও আমারে ভালো লাগে! যাক, পরীক্ষার আগে ভালোভাবে খাবি। খালি পেটে পড়া মাথায় ঢুকে না। অবশ্য এই ব্যাপারে তোরে নিয়া চিন্তা নাই। খানা-খাদ্যের দিকে তোর বরাবর ভালো আগ্রহ আছে।’
‘চল, তোকে জিলাপি খাওয়াই।’
মনটা আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাচ্ছে। জিলাপির মধ্যে জাদু আছে।
শফি ভাইয়ের দোকানে জিলাপিতে কামড় দিয়ে স্যার বললেন, ‘পরীক্ষার হলে নিজেকে “কাবিল” ভাববি।’
‘কী ভাবব, স্যার?’ একটু অবাক হয়ে বললাম।
‘পরীক্ষার হলে ভাববি, তোর চেয়ে ভালো প্রস্তুতি কারো নাই। তুই হলি বিরাট কাবিল। এইটা ভাবতে পারলে অর্ধেক কাম ফতে। পরীক্ষা ভালো হওয়া ঠেকায় কে?’
৩) এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিল জুন মাসে। সেদিন বিকেল থেকে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে সন্ধ্যার সময় কলোনি স্কুলের দপ্তরি গেদু ভাইয়ের ঘণ্টা বেজে উঠল।
কোনো ভালো খবর পেলেই তিনি সময়-অসময়ে ঘণ্টা বাজান। সেটার শব্দ শুনে ছাত্র-শিক্ষক সবাই কী ঘটেছে, তা জানতে স্কুলে ছুটে যান। এটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গিয়েছিল।
তাঁর ঘণ্টা শুনে সবাই স্কুলের দিকে ছুটল।
বৃষ্টির কারণে স্কুল মাঠে হাঁটুসমান পানি জমেছে। কিছুক্ষণ পর একজন ছাত্র ‘হুররে…’ বলে সেই পানিতে ঝাঁপ দিল। সাথে সাথে অন্যরা। মেয়েরা পানিতে নামল না, কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।
তাদের তালির সাথে ঢং ঢং করে বাজছে গেদু ভাইয়ের ঘণ্টা।
হাসনাত স্যার হঠাৎ মহিউদ্দিন স্যারকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলেন, সাথে নিজেও ঝাঁপ দিলেন। সাহস পেয়ে ছাত্ররা অন্য স্যারদেরও ঝাপ্টে ধরে পানিতে নামাল।
একটু পর দেখা গেল শ-দুয়েক ছাত্র-শিক্ষক জলকেলিতে মেতে উঠেছেন।
পানিতে উল্লাস, আকাশে মেঘ, বারান্দায় মেয়েদের হাততালি আর গেদু ভাইয়ের ঘণ্টা—সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো একটি দৃশ্য!
শুধু মৌলভী আজমতউল্লাহ স্যার বারান্দায় দাঁড়িয়ে খুব বিরক্তি নিয়ে দৃশ্যটি দেখছেন। বাড়াবাড়ি তাঁর বড়ই না-পছন্দ।
একটু পর ‘সবাই কি পাগল হয়ে গেল নাকি’ বলতে বলতে আজমতউল্লাহ স্যার নিজেই পানিতে ঝাঁপ দিলেন…