• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন

রাজস্ব আয় কম ঋণের নতুন উৎস খুঁজছে সরকার

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণ সবসময়ই বেশি থাকায় বাজেট বাস্তবায়নের শুরু থেকেই ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাজস্ব আয় আশানুরূপভাবে না বাড়ায় বাধ্য হয়েই সরকারকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার মোট এক লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই নেওয়া হয়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা মূলত দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে এসেছে। যদিও অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সরকার সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে। অন্যদিকে, গত অর্থবছরে বিদেশি উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক খাত থেকে সরকার মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার চরম শঙ্কা তৈরি হয়। মূলত এই নেতিবাচক প্রভাব এড়াতেই সরকার এখন ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ঋণের নতুন ও বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে
বিকল্প অর্থায়নের অংশ হিসেবে সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের এক বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে চীন, জাপান, হংকং এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বা সভরেন বন্ড ছাড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কৌশল নির্ধারণের জন্য গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক উপদেষ্টা তানভীর গাণিককে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই কমিটির প্রাথমিক পর্যালোচনা ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতিমধ্যে এই প্রস্তাবনায় সম্মতি প্রদান করেছেন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অনুমোদন পাওয়া গেলেই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের এই জটিল প্রক্রিয়ায় কৌশলগত পরামর্শক হিসেবে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান এবং দি হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেডের (এইচএসবিসি) বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চারটি ভিন্ন দেশের বাজারে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের বন্ড ছাড়া হবে। এর মধ্যে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যুকৃত চীনা মুদ্রা ইউয়ানভিত্তিক ‘পান্ডা বন্ড’ ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইভাবে জাপানের বাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ‘সামুরাই বন্ড’, হংকংয়ের বাজারে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রচলিত ডলারভিত্তিক বন্ড ইস্যু করার কথা জোরালোভাবে ভাবা হচ্ছে। গত ২০ জুন অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর প্রস্তুতিসংক্রান্ত এক বৈঠকে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছিলেন যে, অতীতে ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে অর্থ বিভাগ সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। তবে বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে, যদিও অনুকূল সুদে বন্ড ইস্যুর জন্য দেশের ঋণমান বা ক্রেডিট রেটিং আরও উন্নত করা অত্যাবশ্যক
আন্তর্জাতিক বন্ডের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে সরকার মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোর বিপরীতে সুকুক বা ইসলামী বন্ড ইস্যুর বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি অর্থ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত ও নির্মাণাধীন সেতুসহ অন্যান্য বড় অবকাঠামোর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুকুক ইস্যুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২০ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক ইস্যু করে আসছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হয়েছে, যা মূলত নিরাপদ পানি সরবরাহ, শিক্ষা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর বেশিরভাগই নন-ট্রেডেবল বা বিক্রয়যোগ্য না হওয়ায় মেয়াদ শেষের আগে ভাঙানো যেত না। সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যু করা হয়েছে এবং সরকার এখন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেডেবল সুকুক ইস্যুর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে বন্ধকি ঋণ এবং সবুজ ও নীল বন্ডের মতো থিমেটিক বন্ড ছাড়ার উদ্যোগও চলমান রয়েছে
বিকল্প অর্থায়নের এই সন্ধানের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও বড় অঙ্কের বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের জন্য ১৫০ কোটি ডলারের বিশাল বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে। এর একটি বড় অংশ, প্রায় ৭৮৫ মিলিয়ন ডলার, বিদ্যমান ১২টি ধীরগতির চলমান প্রকল্পের অব্যবহৃত ঋণ থেকে সরিয়ে সরাসরি বাজেট সহায়তায় রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি সার ও খাদ্য আমদানির জন্য ৩০ কোটি ডলার এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসন ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য আরও ৪০ কোটি ডলার এই সহায়তার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গেও ১৪০ কোটি ডলারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ কোটি ডলার সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করার কাজে ব্যবহৃত হবে। এছাড়া এডিবি পাঁচ বছর মেয়াদি পাঁচ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ চালু করেছে, যা প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলারের ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করবে
তবে সরকারের এই বহুমুখী ঋণ সংগ্রহের উদ্যোগ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বাজার থেকে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এতে ঝুঁকির মাত্রাও অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে এই স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডের বড় ভূমিকা ছিল বলে তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জোরালোভাবে বলেন যে, বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো বহুপক্ষীয় ঋণের তুলনায় বাণিজ্যিক বাজার থেকে নেওয়া এই ঋণ অনেক বেশি শর্তযুক্ত এবং এটি কোনোভাবেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের বিকল্প হতে পারে না। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হকও এই বিষয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তিনি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারভিত্তিক বন্ড ইস্যু করলে বিনিময় হার এবং উচ্চ সুদ পরিশোধের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে অতীতে চরম চাপ সৃষ্টি করেছিল। তদুপরি, আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণ টেকসই হওয়ার ঝুঁকি ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে এবং মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়েছে। এই অস্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category