• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

সন্দেহজনক ভ্রমণ: ৫ বছরে বিমানবন্দর থেকে ফেরত ৮১ হাজারেরও বেশি যাত্রী

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

উন্নত জীবন ও নিশ্চিত কর্মসংস্থানের আশায় প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি নানা দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে এসে। ভিসা জালিয়াতি, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অসংগতি এবং অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টার কারণে হাজার হাজার যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকেই বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে অন্তত ৮১ হাজার ৫০০ যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিদেশযাত্রা বাতিলের নেপথ্যে কাজ করছে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র, ভুয়া ভিসা তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি এবং কখনো কখনো ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২ কোটি ৯১ লাখেরও বেশি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ জন বিদেশে যান, তবে নথিপত্রে অসংগতি থাকার কারণে ৭ হাজার ৮১৯ যাত্রীকে এই সময়ে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগের বছরগুলোতেও চিত্রটি একই রকম ছিল। ২০২৪ সালে ১৮ হাজার ৯ জন, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৮৭২ জন, ২০২২ সালে সর্বাধিক ১৮ হাজার ৭৫৬ জন এবং ২০২১ সালে ১১ হাজার ৫২৮ জন বিদেশগামীর যাত্রা বাতিল করা হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্যমতে, বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের ফেরত পাঠানোর পেছনে অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, রোমানিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোও রয়েছে।
বিমানবন্দরে ধরা পড়া জালিয়াতির কৌশলগুলো দিন দিন আরও আধুনিক ও জটিল হচ্ছে, যা ইমিগ্রেশন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তাসলিমা বেগম (ছদ্মনাম) নামের এক নারী ওমানে তার স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে আসেন। তার কাছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্সও ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার জেরার মুখে তাসলিমা জানান, তাদের বিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে হয়েছে এবং তার কাছে কোনো বৈধ কাবিননামা নেই। প্রমাণস্বরূপ একটি বিয়ের ছবি দেখালে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন সেটি ফটোশপ করা। পরবর্তীতে ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই করে দেখা যায়, তাসলিমার স্বামী পরিচয়ে ব্যবহৃত একই স্পাউস বা পারিবারিক ভিসা দিয়ে চক্রটি এর আগে আরও পাঁচজন নারীকে ভিন্ন ভিন্ন পাসপোর্টে ওমানে পাঠিয়েছে। এই অবিশ্বাস্য জালিয়াতি ধরা পড়ার পর তাসলিমার যাত্রা বাতিল করা হয়। ওমানে বর্তমানে সাধারণ কর্মী ও নারী গৃহকর্মী ভিসা বন্ধ থাকায় চক্রগুলো এ ধরনের অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে।
শুধু ওমান নয়, ইতালিতে পারিবারিক ভিসা নিয়েও গড়ে উঠেছে বিশাল জালিয়াতি চক্র। ইতালীয় সরকারের দেওয়া বিপুল সংখ্যক পারিবারিক ভিসার সুযোগ নিয়ে চক্রগুলো ‘পেজ সাবস্টিটিউশন’ বা পৃষ্ঠা প্রতিস্থাপনের মতো জঘন্য কাজ করছে। তারা প্রথমে প্রকৃত ভিসা দিয়ে একজনকে ইতালিতে পাঠায়। ভ্রমণ শেষে সেই পাসপোর্টের ভিসা ও অ্যারাইভাল সিল হুবহু নকল করে ওই পাতাটি কেটে অন্য একজনের পাসপোর্টে লাগিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিকে বাছাই করা হয় যার চেহারা প্রথম ব্যক্তির সাথে অনেকাংশে মিলে যায়, যাতে প্রাথমিকভাবে কোনো সন্দেহ তৈরি না হয়। অন্যদিকে, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসবির একজন কর্মকর্তা জানান, ১২ বছর ফ্রান্সে থাকা এক বাংলাদেশি প্রায় ১০ হাজার ইউরো খরচ করে ভুয়া সুইস পাসপোর্ট বানিয়ে দেশে ফেরার সময় ইমিগ্রেশনে ধরা পড়েন। এছাড়াও নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের তরুণরা ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছে বলে ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরে এসেছে।
তবে সব ক্ষেত্রে যে যাত্রীরাই প্রতারণা করছেন তা নয়, অনেক সময় ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়। শিক্ষার্থী তালহা রহমান থাইল্যান্ডে প্রথম বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার রোষানলে পড়েন। সব বৈধ নথি থাকার পরও তাকে আটকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। তবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলার পর তিনি ছাড় পান। অন্যদিকে আশিকুর রহমান নামের এক যাত্রীর মালয়েশিয়া যাত্রার সব কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও তাকে আটকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার ভয় দেখানো হয়। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি বিমানে ওঠার অনুমতি পান। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ক্ষমতা বা ‘পাওয়ারফুল কানেকশন’ অনেক সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে।
এই বহুমুখী সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন। অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, শুধু চক্র ধরে লাভ নেই, বরং বিএমইটি ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি স্বরাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাইকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন, যাতে সন্দেহভাজন যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই ডিজিটাল অ্যালার্টের মাধ্যমে থামানো যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ জানান, অবৈধ অভিবাসন রুখতে ইমিগ্রেশন পুলিশকে আরও সক্রিয় করা হয়েছে এবং যাত্রীদের আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে পার করার বা অযথা হয়রানি করার যে অভিযোগ ওঠে, তার কিছু কিছু সত্য।
সার্বিকভাবে, বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষের বিদেশযাত্রা আটকে যাওয়ার এই ঘটনা শুধু পরিসংখ্যানগত কোনো বিষয় নয়, এটি প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক স্বীকার করেছেন যে, বিএমইটির অনেক অসাধু কর্মকর্তা যাচাই না করেই চোখ বুজে ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছেন। বিএমইটির কাছে সব দেশের ভিসা যাচাইয়ের অ্যাকসেস না থাকার দুর্বলতাটিকে চক্রগুলো কাজে লাগাচ্ছে। তিনি জানান, লাওস, কম্বোডিয়া, সার্বিয়া ও লিবিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভিসা কঠোরভাবে যাচাই করতে বলা হয়েছে। শিগগিরই বিএমইটিতে ইমিগ্রেশন পুলিশের একটি বিশেষ দল বসিয়ে যৌথ ভিসা ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো যদি দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই হয়তো হাজারো সাধারণ মানুষকে বিমানবন্দর থেকে চোখের পানি ফেলে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে আসতে হবে না।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category