আমার ভারি ভারি লেখা পড়ে বিরক্ত? আমার নিজেরই তো বিরক্ত লাগে মাঝে মাঝে। তাই চলুন, আজ মজার গল্প করি।
বিয়েতে মাঝে মাঝে কিছু কাণ্ড ঘটে। সাধারণত এগুলো ঘটান জামাই শ্রেণির লোকজন। মেয়ের জামাই, বোন জামাই, শালীর জামাই।
কী ধরনের কাণ্ড?
প্রথমে নিজের জেলা দিয়ে বোঝাই—
১) চট্টগ্রামের বিয়েতে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো একজন জামাই সব দায়িত্ব পালন করছেন। কাজির ব্যবস্থা করা, বাবুর্চি ঠিক করা, ডেকোরেটর ঠিক করা, রান্না তদারক করা—সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
বিয়ের দিন মনে হবে, তিনি আট-দশজন যমজ ভাই নিয়ে পুরো বিয়ে সামলাচ্ছেন। যেদিকেই তাকাবেন, তাঁর ছুটোছুটি দেখবেন।
সব দায়িত্ব পালন করে বিয়ের শেষ মুহূর্তে তিনি একটি কাণ্ড করবেন—তা হলো, তিনি ঘোষণা দেবেন, ‘আঁই ভাত ন হাইয়ুম।’ (আমি ভাত খাবো না)
তাঁর কথা শুনে সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে!
শ্বশুর-শাশুড়ি ছুটে আসবেন। তাঁর হাত ধরে অনুনয় করে বলবেন, ‘জামাই, তুঁই ভাত ন হাইবা কা?’ (জামাই, তুমি ভাত খাবে না কেন?)
শালা-শালী বলবে, ‘দুলাভাই, অনে ভাত কিল্লাই ন হাইবেন?’ (দুলাভাই, আপনি ভাত খাবেন না কেন?)
জামাই তখন উত্তর দেবেন, ‘আঁত্তে ভুক নাই দি। আঁই গোস্বা ন অই তো।’ (আমার খিদে নেই। আমি রাগ করিনি তো)
এর মানে ঘটনা খারাপ।
তিনি গোস্বা করেছেন। কারণ কী, তা কেউ জানে না!
২) একবার বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলাম। ফেনীর মহিপাল পৌঁছে হঠাৎ বাস থেমে গেল। শুধু আমাদের বাস না। দুদিক থেকে আসা সব গাড়িঘোড়াই বন্ধ। বিরাট জ্যাম লেগে গেল। বিরক্ত হয়ে এর কারণ জানার জন্য নিচে নামলাম।
দেখলাম, পাতলা-দুবলা এক লোক রাস্তা থেকে ক্ষেতের আইলে নামার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। আরেক দল লোক জান দিয়ে তাঁকে বিপরীত দিকে টানছেন।
খোঁজ নিয়ে জানলাম, পাশের গ্রামে একটি বিয়ে হচ্ছে। শুকনো লোকটি সে বাড়ির বড় জামাই। কোনো এক কারণে তিনি রাগ করে বিয়ের আসর ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। তাই আইল ধরে হাঁটা দিয়েছেন। আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে টেনে বিয়েবাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই টানাটানিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে আপাতত বন্ধ!
৩) অদ্ভুত এক কাণ্ড দেখেছিলাম আমার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে।
তাদের পাশের বাড়িতে রাতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হবে।
পৌঁছার কিছুক্ষণ পর দেখি, কয়েকজন কিশোর-তরুণ দিনদুপুরে টর্চ হাতে নিয়ে কই যেন যাচ্ছে।
বন্ধুটি জিজ্ঞেস করল, ‘কই যাস?’
উত্তর এলো, ‘দুলাভাই একটার ট্রেনে বাড়ি আসবে। তারে আনতে যাই।’
‘এই কড়কড়া দুপুরে টর্চের কাজ কী?’
‘তারে খুব আঞ্জাম কইরা রিসিভ না করলে তিনি গোস্বা করবেন।’
‘টর্চ জ্বালাইয়া এই রকম ফকফকা রোদে তারে বাড়ি আনবি?’
‘সব সময় জ্বালামু না। আগাইয়া আনার সময় মাঝে মধ্যে জ্বালামু-নিভামু। তাইনে খুশি হইব। মাথা গরম মানুষ, কখন কী করে ঠিক নাই। তাই আঞ্জাম ঠিক রাখন দরকার।’
৪) শালীর বিয়েতে সে বাড়ির বড় জামাই খুব রাগ করেছেন। কারণ এ বিয়েতে বরকে খাসির আস্ত রোস্ট দেওয়া হয়েছে। তাঁকে নাকি বুড়া মুরগির রোস্ট দেওয়া হয়েছিল। এ বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি বিয়ে বর্জন করবেন।
সবাই তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন—তিনি তা না শুনে হনহন করে হাঁটা শুরু করেছেন। শ্বশুরবাড়ির ছেলেবুড়ো সবাই তাঁর হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করছেন।
আমার সাথে বয়সে বড় একজন কাজিন ছিলেন। বেশ রসিক। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘আসলে উনি কেন রাগ করেছেন, জানো?’
আমি বললাম, ‘খাসির রোস্ট…।’
তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে না। ওইটা উসিলা মাত্র। আসলে উনি রাগ করেছেন, কারণ হৈচৈ শুনে সবাই জিজ্ঞেস করবে, বেজার হইছে যে হেই মিয়া কে? তখন সবাই উত্তর দেবে, হেই মিয়া এই বাড়ির বড় জামাই।
বড় জামাই হিসাবে তাঁকে সবার চিনতে হবে না? সে জন্যই উনি বেজার হয়েছেন—যাতে সবাই ওনার মূল্য বুঝতে পারে।
আফটার অল, বড় জামাই বলে কথা! তাঁকে সবাই না চিনলে কি চলে?’
সব জামাই-কাণ্ডের মূল কারণ এটাই।
জামাই হিসাবে নিজের গুরুত্ব এস্টাবলিশ করতে হবে না!
#আসুন মায়া ছড়াই