বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে ঢেলে সাজানো, দুধ ও মাংসের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিদের জীবনমান উন্নয়নের এক বিশাল স্বপ্ন দেখিয়ে শুরু হয়েছিল একটি মেগা প্রকল্প। প্রকল্পটির গালভরা নাম ছিল ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প’ বা সংক্ষেপে এলডিডিপি। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের মোট বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল চার হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ অর্থের জোগানদাতা ছিল আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। সাধারণ মানুষের করের টাকায় পরিশোধযোগ্য এই বিশাল ঋণের টাকায় দেশের ডেইরি শিল্পের চেহারা বদলে যাওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা এই প্রকল্পের সরাসরি সুবিধা পাবেন, তারা আধুনিক প্রযুক্তি পাবেন এবং তাদের উৎপাদিত দুধ ও মাংস সংরক্ষণের জন্য দেশব্যাপী হিমাগার ও আধুনিক কারখানা গড়ে উঠবে। এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের অধীনে ‘ম্যাচিং গ্রান্ট’ বা সরাসরি আর্থিক অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। নিয়ম করা হয়েছিল যে, কোনো খামারি যদি আধুনিক কারখানা স্থাপন করতে চান, তবে তার মোট খরচের অর্ধেক বহন করবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং এই পুরো টাকাটাই দেওয়া হবে একেবারে বিনামূল্যে বা অনুদান হিসেবে। সদ্য সমাপ্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের মার্চ মাসে শেষ হওয়ার পর যখন এর খতিয়ান মেলাতে যাওয়া হলো, তখন বেরিয়ে এলো এক ভয়ংকর ও শিউরে ওঠার মতো দুর্নীতির চিত্র। দেখা গেল, খামারিদের উন্নয়নের আড়ালে এই প্রকল্পের পরতে পরতে হয়েছে অর্থ লোপাটের এক বিশাল ও সুপরিকল্পিত কারসাজি।
প্রান্তিক খামারিদের ভাগ্য বদলের এই প্রকল্পের আসল চিত্রটি বুঝতে হলে সবার আগে যেতে হবে রাজশাহীর দুর্গম মিডেল চরে। পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা এই ছোট্ট চরে গড়ে উঠেছে গরু পালনের এক বিশাল ও সংগ্রামমুখর জনপদ। এখানকার মানুষের জীবনের একমাত্র অবলম্বন হলো গবাদিপশু পালন। ধারদেনা করে, দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এই চরের প্রতিটি পরিবার গড়ে বিশ থেকে ত্রিশটি পর্যন্ত গরু পালন করে থাকে। প্রতিদিন এই চর থেকে উৎপাদিত হয় হাজার হাজার লিটার খাঁটি দুধ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গরু আর দুধ বিক্রি করেই যাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তারা এই বিশাল প্রকল্পের এক কানাকড়ি সুবিধাও পাননি। চরের খামারিদের আক্ষেপ, তারা গরু পালন করেন, নিজেরাই নিজেদের উৎপাদিত দুধ খান, কিন্তু বাজারে গেলে তারা তাদের কষ্টের কোনো ন্যায্য দাম পান না। বাজারে যেখানে এক লিটার দুধের দাম আশি টাকা, সেখানে সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে তারা বাধ্য হয়ে মাত্র পঞ্চাশ টাকা লিটারে দুধ বিক্রি করে দেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাই কখনো এই দুর্গম চরের খামারিদের খোঁজ নিতে আসেননি। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ঋণের কিস্তির চাপে পিষ্ট হয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে তাদের খামার ছোট করে ফেলেছেন, আর কেউ কেউ চিরতরে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ এই চরের মতো জায়গাগুলোতেই দুধ সংরক্ষণের জন্য চিলিং সেন্টার বা আধুনিক কারখানা স্থাপনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। প্রাণীজ আমিষ আর দুগ্ধপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ভিত্তিতে দেশজুড়ে ব্যক্তি উদ্যোগে যে বিপুল সংখ্যক খামার গড়ে উঠেছিল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রান্তিক খামারিদের বঞ্চিত করে এলডিডিপি প্রকল্পের সেই ৩০০ কোটি টাকার অনুদান বা গ্রান্ট কাদের পকেটে গেছে, তার সন্ধানে নামলেই বেরিয়ে আসে দুর্নীতির এক কুৎসিত রূপ। অনুসন্ধানের শুরুতেই চোখ পড়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার দিকে। এখানকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান তার কারখানায় আধুনিক উপায়ে মিষ্টি, দই ও ঘি উৎপাদনের চমকপ্রদ প্রস্তাবনা দেখিয়ে সরকারি অনুদান হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো সেই জাঁকজমকপূর্ণ কারখানার ঠিকানায় গিয়ে দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। কারখানার বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাধারণ বসতবাড়ি। সেই বাড়ির একটি পরিত্যক্ত কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে যন্ত্র। মাহবুবুর রহমানকে সাথে নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর চাবি না পেয়ে শেষমেশ তালা ভেঙে সেই কক্ষে প্রবেশ করতে হলো। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, আধুনিক যন্ত্রপাতির বদলে সেখানে পড়ে আছে পুরনো ও মরিচা ধরা দুটি অকেজো যন্ত্র। ধুলোবালির পুরু আস্তরণ দেখেই খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, এই যন্ত্রগুলো আজ পর্যন্ত একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি। মাহবুবুর রহমান নির্লজ্জভাবে অজুহাত দেখালেন যে, এগুলো বাইরের দেশ থেকে আনা মেশিন এবং গ্রাম এলাকায় যাতায়াতের ঝামেলার কারণে এগুলো এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। সরকারি অনুদানের টাকা পকেটে পুরে এভাবেই বছরের পর বছর ধরে একটি ভুয়া কারখানার নাটক সাজিয়ে রেখেছেন তিনি।
কুমিল্লার দুর্নীতির এখানেই শেষ নয়। সদর দক্ষিণ উপজেলার পাশের গ্রাম কনেশতলায় ‘হ্যাপি মিট অ্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঠিক একই পরিমাণ অনুদান পেয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল, নির্দিষ্ট ঠিকানায় বিশাল এক আলিশান বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেখানে কোনো কারখানার অস্তিত্ব তো দূরে থাক, কেউ বসবাসও করে না। স্থানীয় বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা এই এলাকায় কখনো কোনো ডেইরি বা মিট কারখানা দেখেননি। অনুদান পাওয়া কাজী সেলিনা পারভীন নামের ওই নারীর স্বামীর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জানান যে কারখানাটি আপাতত বন্ধ আছে। একই এলাকার ‘আবদুল্লাহ ডেইরি ফার্ম’ এবং ‘আমিনা ফিডমিল সেন্টার’ নামের আরও দুটি প্রতিষ্ঠান অনুদানের মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, একটি প্রতিষ্ঠান আসলে মুদি দোকান হিসেবে চলছে আর অন্যটির দরজায় ঝুলছে বিশাল এক তালা। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো, পাশাপাশি অবস্থিত এই দুটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক আসলে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। স্মল স্কেল গ্রান্ট বা ক্ষুদ্র অনুদানটি নেওয়া হয়েছে স্ত্রী আফরোজা আক্তারের নামে এবং ফিডমিলের নামে ২২ লাখ টাকার বিশাল অনুদানটি বাগিয়ে নিয়েছেন তার স্বামী তোফায়েল। তোফায়েল অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তৎকালীন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহ আলম বিশ্বাসের সাথে তাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল এবং সেই সম্পর্কের জোরেই তারা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের একটি গোপন তদন্ত প্রতিবেদনেও দেখা গেছে যে, শুধু এই স্বামী-স্ত্রীই নন, তাদের একই পরিবারের আরও দুজন সদস্য এই প্রকল্পের অনুদান পেয়েছেন। অর্থাৎ, একটি মাত্র পরিবার কোনো খামার না করেই সরকারের ৬০ লাখ টাকা লুট করে নিয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই পুরো জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় এলডিডিপি প্রকল্পের পরিচালক এবং উপপরিচালকরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। একটি চক্র একটি পুরনো মেশিন কিনে সেটি দিয়েই একাধিক ভুয়া কারখানা দেখিয়ে বারবার অনুদানের টাকা তুলে নিয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ অফিসাররাও এসব ভুয়া বিল-ভাউচারে চোখ বন্ধ করে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নামে হরিলুটের এই ধারা কেবল কুমিল্লাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ষাটশালায় ‘সানফ্লাওয়ার ডেইরি ফার্ম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে তিন লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ওই এলাকায় এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্মই হয়নি। তবে দুর্নীতির সবচেয়ে নির্লজ্জ উদাহরণটি তৈরি হয়েছে গাজীপুরের কালীগঞ্জে। সেখানে ‘সোনপাড়ি মিঠাইঘর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার বিশাল অনুদান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের টিকিটিরও দেখা মেলেনি। সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, অস্তিত্বহীন এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে কান্তা নামের এক নারীর নাম উল্লেখ রয়েছে। অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এক পিলে চমকানো তথ্য। এই কান্তা নামের নারীটি আর কেউ নন, তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার ইউসুফ হাবিবের আপন স্ত্রী। একজন সরকারি কর্মকর্তা, যার দায়িত্ব ছিল প্রকৃত খামারিদের খুঁজে বের করে তাদের হাতে অনুদানের টাকা পৌঁছে দেওয়া, তিনি নিজেই ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কান্তা কোনো খামারি ছিলেন না, কিন্তু তার স্বামী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে প্রকল্পের শীর্ষ কর্তাদের যোগসাজশে সহজেই এই অর্থ ছাড় করিয়ে নিয়েছেন। কান্তার ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে অনুদানের ৯ লাখ টাকা তার হিসাব থেকে তুলে নিয়েছেন খোদ সেই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার হাবিব। যদিও বর্তমানে এই দম্পতির মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নেই, কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থ লুটের দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এই দুর্নীতির বিষয়ে ডাক্তার হাবিবের মুখোমুখি হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি, বরং বদলি হয়ে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে নিজের দায় এড়ানোর নির্লজ্জ চেষ্টা করেছেন। কালীগঞ্জের পাশেই কাপাসিয়া উপজেলার ‘জুহি লাবিব ডেইরি’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়েও অনুদানের টাকায় কেনা কোনো যন্ত্রপাতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জাহাঙ্গীর আলম রাজনৈতিক কারণ ও হামলার হাস্যকর অজুহাত দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে যেখানে লাখ লাখ টাকার অনুদান স্বজনপ্রীতি আর জালিয়াতির মাধ্যমে লুট হয়েছে, সেখানে মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তাদের বেলায় দুর্নীতির অঙ্কটা কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বামনাখালীতে ‘কেসি এগ্রো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ডেইরি হাব এবং ২০টি গ্রামভিত্তিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র বা ভিএমসিসি স্থাপনের কথা ছিল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার বিপুল অনুদান দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বিশাল অঙ্কের অনুদান পাওয়ার পরও কারখানাটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায় এক ভুতুড়ে পরিবেশ। কারখানায় মানুষের কোনো আনাগোনা নেই, আর ভেতরে দুধ পাস্তুরাইজেশনের মূল মেশিনটিও গায়েব। কারখানার এক কর্মী কারিগরি ত্রুটির অজুহাত দিয়ে মেশিন বন্ধ থাকার কথা জানালেও, নথিপত্র ঘেঁটে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির এক মহারহস্য। কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে যে, উদ্যোক্তা আতিকুল্লাহ বাহার ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় করে ২৬টি আধুনিক মেশিন কিনেছেন, যার অর্ধেক টাকা প্রকল্প থেকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কারখানায় যে কয়টি মেশিন পাওয়া গেছে, তার সবগুলোই পুরনো এবং অকেজো। অনুসন্ধান করে পুরনো মেশিন ব্যবসায়ী লুৎফুর রহমান স্বপনের খোঁজ পাওয়া যায়, যার প্রতিষ্ঠান ‘সানিয়া ট্রেডার্স’ থেকে অত্যন্ত কম দামে এই পুরনো মেশিনগুলো কিনেছিলেন আতিকুল্লাহ। স্বপন নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তার কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে বাতিল মেশিন কিনে সরকারের কাছে সেগুলোর দাম ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ এই ভুয়া মেশিন কেনার বিল-ভাউচারে চোখ বন্ধ করে স্বাক্ষর করেছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার নাজনীন সুলতানা। তার কাছে এই দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ প্রকল্প পরিচালক, উপপরিচালক এবং অতিরিক্ত সচিবদের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কেসি এগ্রোর যে ২০টি গ্রামভিত্তিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র করার কথা ছিল, সেগুলোর একটির ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায় সেখানে একটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ, পুরোটাই ছিল একটি বিশাল কাগুজে জালিয়াতি।
এলডিডিপি প্রকল্পের ম্যাচিং গ্রান্টের আওতায় এরকম ১৫ জন বড় উদ্যোক্তাকে মোট ৪০ কোটি টাকার বিশাল অনুদান দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রধান শর্ত ছিল ডেইরি হাব এবং ৩০০টি গ্রামভিত্তিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ে তোলা। এই বিশাল অনুদান পাওয়া আরেকজন ভাগ্যবানের নাম নাজিমুদ্দিন, যিনি চুয়াডাঙ্গা সদরের দিননাথপুর ইউনিয়নে ‘সৃষ্টি ডেইরি হাব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। প্রকল্পের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে এই নাজিমুদ্দিনের সাফল্য নিয়ে একটি বিশাল প্রামাণ্যচিত্রও প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু সরেজমিনে তার কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতির ছিটেফোঁটাও নেই, বরং কারখানার ভেতরে সম্পূর্ণ সনাতন ও মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে হাতে মিষ্টি বানানোর কাজ চলছে। ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার বিশাল অনুদান পাওয়ার পরও তারা এখনো আধুনিক উৎপাদনে যেতে পারেননি। উৎপাদনে যেতে না পারার কারণ হিসেবে নাজিমুদ্দিনের ছেলে সালাউদ্দিন যে বিস্ময়কর তথ্যটি দিলেন, তা দেশের প্রকল্প দুর্নীতির এক ধ্রুপদী উদাহরণ। তিনি অকপটে স্বীকার করলেন যে, অনুদানের আড়াই কোটি টাকার মধ্যে দেড় কোটি টাকারও বেশি অর্থ তাদের খরচ করতে হয়েছে প্রকল্পের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের পকেটে ঘুষ হিসেবে দিতে গিয়ে। নিচতলা থেকে শুরু করে ওপরতলা পর্যন্ত প্রতিটি টেবিলে বিল পাসের জন্য তাদের এই বিশাল অঙ্কের ঘুষের টাকা ছড়াতে হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও এই দুর্নীতির দায় নিতে অস্বীকার করে বলেন যে, ঢাকা থেকে প্রকল্প পরিচালক এবং চিফ টেকনিক্যাল কোঅর্ডিনেটর সরাসরি এসে পরিদর্শন করে বিল পাস করেছেন, এতে তার কোনো হাত ছিল না।
প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে ব্যক্তিগত সখ্যতা থাকলে যে অনুদানের কোটি টাকা কীভাবে পুকুরচুরি করা যায়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো নওগাঁ সদর উপজেলার ‘ফ্রন্টেরা ডেইরি হাব’। এই ডেইরি হাবের ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোনো দুধের কারখানা নেই, বরং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল অটো রাইস মিল বা চালকল। এই চালকলের মালিক নিপেন মজুমদার। চালের ব্যবসায়ী হয়ে তিনি কীভাবে দুধের প্রকল্পের কোটি টাকার অনুদান পেলেন, সেই রহস্যের জট খুলতে গিয়ে বেরিয়ে আসে স্বজনপ্রীতির এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। নিপেন মজুমদার নিজেই দম্ভভরে স্বীকার করেন যে, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব থেকে শুরু করে এলডিডিপি প্রকল্পের উপপরিচালক ডাক্তার হিরণময় বিশ্বাস—সবাই তার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী এবং অন্তরঙ্গ বন্ধু। এই বন্ধুত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়েই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রকল্পের তিন কোটি টাকার তিনটি বিশাল অনুদান নিজের পকেটে পুরেছেন। নিজের নামে নিয়েছেন স্মল স্কেল মিল্ক প্রসেসিংয়ের অনুদান, নিজের বড় ভাই বিজয় মজুমদারের নামে নিয়েছেন বায়োগ্যাস প্লান্টের অনুদান এবং নিজের বাল্যবন্ধু ও সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দেবাশীষ দাসের নামে নিয়েছেন ফ্রন্টেরা ডেইরি হাবের অনুদান। সরকারি কোষাগারের অর্থকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার এই মহোৎসব সম্পর্কে নিপেন মজুমদারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন যে, এটি কোনো সমস্যাই নয়, কারণ মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বয়ং তার কারখানায় এসে ভিজিট করে গেছেন। অথচ বাস্তবে এই তিনটি প্রকল্পের একটিও তিনি আজ পর্যন্ত চালু করতে পারেননি। ২০টি গ্রামভিত্তিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র করার কথা থাকলেও একটিরও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নওগাঁ সদরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অত্যন্ত অসহায়ত্বের সুরে জানান যে, তিনি নিজে এই ভুয়া প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে লিখিতভাবে নেতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছিলেন, কিন্তু ঢাকা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে তার রিপোর্টকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অনুদানের টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তি পর্যায়ের অনুদানে যখন পদে পদে এমন সীমাহীন দুর্নীতি আর জালিয়াতি, তখন খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই অনুদানের অর্থ কীভাবে লুট হয়েছে, সেই চিত্রটি আরও বেশি ভয়ংকর। সাভারের সরকারি গো-প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামারে পর্যাপ্ত আধুনিক মেশিন থাকা সত্ত্বেও তারা সম্পূর্ণ নতুন করে যন্ত্রপাতির চাহিদা দেখিয়ে এলডিডিপি প্রকল্প থেকে ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার বিশাল অনুদান বাগিয়ে নেয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অনুদানের টাকায় কেনা বেশিরভাগ যন্ত্রপাতিই অত্যন্ত পুরনো ও নিম্নমানের। ডেইরি প্রকৌশলী গোলাম মর্তুজা নিজের মুখেই স্বীকার করেন যে মেশিনগুলো দেখতে পুরনো। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই মেশিনগুলো সরবরাহ করেছে ‘আর্কেড ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যাদের মূল ব্যবসা হলো ডেন্টিস্ট বা দাঁতের ডাক্তারদের যন্ত্রপাতি বিক্রি করা। দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের ভারী মেশিনপত্র সরবরাহের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই তাদের ছিল না। এই প্রকৌশলীর যোগসাজশেই ডেন্টাল ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পুরনো ডেইরি মেশিন কেনা হয় এবং কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই মেশিন বুঝে পাওয়ার কাগজে স্বাক্ষর করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ডেইরি ইকোনমিস্ট ডাক্তার মোহাম্মদ খুরশেদ আলম, ডেইরি অফিসার রেজোয়ানা আফরিন খান এবং সায়েন্টিফিক অফিসার মাহমুদুল হাসানসহ সবাই এই লুটপাটের যাচাই কমিটিতে ছিলেন। ক্যামেরার সামনে তারা কেউ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং নিজেদের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
দুর্নীতির এই মহোৎসবের পাশাপাশি প্রকল্পটিতে দেখা গেছে চরম নৈতিক স্খলন ও আদর্শিক বিচ্যুতি। ম্যাচিং গ্রান্ট বা অনুদানের মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক পর্যায়ের এমন সব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো, যাদের মেধা আছে কিন্তু অর্থের অভাবে খামার বড় করতে পারছেন না। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই অনুদানের কোটি কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ও বিলিয়নিয়ার করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত ফজলে হাসান আবেদের মেয়ে তামারা হাসান আবেদ, প্রাণ গ্রুপের এমডি ইলিয়াস মৃধা, আখতার গ্রুপের এমডি এম আখতারুজ্জামান, আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ শামীমউদ্দিন এবং বগুড়ার বিখ্যাত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গরিবের হক মেরে এই অনুদানের টাকা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কেন সরকারি প্রকল্পের গরিববান্ধব অনুদান দেওয়া হলো, সে বিষয়ে তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া হলেও তারা কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
লুটপাট, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির এই বিষাক্ত বলয়ে পড়ে কীভাবে একজন সৎ ও প্রকৃত উদ্যোক্তা ধ্বংস হয়ে যান, তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার কেন্দুয়ার তরুণ উদ্যোক্তা শেখ সাদাফ ইসলাম। তিনি ডেইরি ফার্ম ও ভিএমসিসির জন্য প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তিনি পুরো দেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিদের আশ্বাসে তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবং নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে তিন কোটি টাকা এই খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু যাচাইয়ে প্রথম হওয়ার পরও তাকে অনুদানের টাকা দেওয়া হয়নি। তার একমাত্র অপরাধ ছিল—তিনি প্রকল্পের অসাধু কর্মকর্তাদের কোনো ঘুষ বা উপঢৌকন দেননি। উপপরিচালক হিরণময় বিশ্বাসসহ অন্যদের বারবার অনুরোধ করার পরও তারা সাদাফকে ফিরিয়ে দেন। আজ এই তরুণ উদ্যোক্তা তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। তার চোখের জলে আজ বিশ্বব্যাংকের সহায়তার আসল স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে যোগ্যরা কাদছে আর দুর্নীতিবাজরা অট্টহাসি হাসছে।
এই চার হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পটিতে পদে পদে যে অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়েছে, তার মূল কারিগর হলেন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা গুটিকয়েক শীর্ষ কর্মকর্তা। কোনো ধরনের মাঠ পর্যায়ের সম্ভাব্যতা যাচাই না করে, সম্পূর্ণ অযোগ্য এবং ভুয়া ব্যক্তিদের নামে অনুদানের কোটি কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে প্রকল্পের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা পরিচালক এবং উপপরিচালকদের সরাসরি হস্তক্ষেপে ও নির্দেশে। মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি দুর্নীতির ফাইলের পেছনে এই শীর্ষ কর্তাদের হাতের অমোঘ ছাপ এবং যোগসাজশ স্পষ্টভাবে মিলেছে। আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্কে বারবার যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তিনি হলেন এলডিডিপি প্রকল্পের অত্যন্ত প্রভাবশালী উপপরিচালক ডাক্তার হিরণময় বিশ্বাস। নওগাঁর চাল ব্যবসায়ী নিপেন মজুমদারের সাথে তার অনৈতিক বন্ধুত্বের প্রমাণ চোখের সামনে তুলে ধরার পরও তিনি নির্লজ্জের মতো তা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। হিরণময় বিশ্বাস ছাড়াও এই মহাদুর্নীতির প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন পর্যায়ক্রমে তিন পরিচালক—আব্দুর রহিম, ডাক্তার মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন এবং ডক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। এছাড়া উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শাহ আলম বিশ্বাস ও হারুনুর রশিদ, এবং প্রকল্পের চিফ টেকনিক্যাল কোঅর্ডিনেটর হিসেবে ছিলেন গোলাম রাব্বানী ও মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। দুর্নীতির অন্যতম হোতা শাহ আলম বিশ্বাস বর্তমানে মিরপুর কেন্দ্রীয় মুরগি খামারের উপপরিচালক হিসেবে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন, কিন্তু গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে তিনি কোনোভাবেই মুখ খুলতে রাজি হননি। গত দেড় মাস ধরে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের জন্য তাদের পিছে পিছে ঘুরেও কাউকেই পাওয়া যায়নি। কেউ দুর্নীতির টাকা পকেটে পুরে অবসরে চলে গেছেন, কারো বা চাকরি অন্য কোনো কারণে চলে গেছে, আবার কেউ কেউ দুর্নীতির পুরস্কারস্বরূপ পদোন্নতি পেয়ে আরও উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। প্রকল্পের সর্বশেষ পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে তার দপ্তরে গিয়ে দুর্নীতির লিখিত প্রমাণ দেখিয়ে প্রশ্ন করা হলেও, তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে ক্যামেরার সামনে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। টিআইবি বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বারবার এ ধরনের মহালুটপাট হওয়ার মূল কারণ হলো জড়িত দুর্নীতিবাজদের কোনোভাবেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারা। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে এই দুর্নীতি অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বার্তা দিচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংকের এই চার হাজার ২৮০ কোটি টাকার অর্থায়ন কোনো অনুদান বা দান নয়। এই বিশাল অঙ্কের টাকা তারা বাংলাদেশকে কঠিন শর্তে ঋণ হিসেবে দিয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের পর কড়ায়-গণ্ডায় সুদসহ ফেরত দিতে হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পের অসাধু কর্মকর্তা, ভুয়া খামারি আর প্রভাবশালী চক্র মিলেমিশে যে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করল, সেই বিশাল অর্থের ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ জনগণকেই তাদের করের টাকা দিয়ে বইতে হবে। এটি শুধু একটি মেগা প্রকল্পের অর্থ লোপাট নয়, এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক খামারিদের স্বপ্ন নিয়ে এক নিষ্ঠুর ও জঘন্য ছিনিমিনি খেলা। শুধু এই ম্যাচিং গ্রান্ট বা অনুদান বিতরণেই নয়, পুরো প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে, কেনাকাটায়, প্রশিক্ষণে এবং অবকাঠামো নির্মাণে হয়েছে সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতি। সরকারি অডিট প্রতিবেদনেও বারবার এই অনিয়মের চিত্র উঠে এলেও, আজ পর্যন্ত কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা এভাবে হরিলুট হওয়ার পরও রাষ্ট্রযন্ত্রের এই নীরবতা দেশের সার্বিক সুশাসনের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
তথ্যসূত্র: স্টার নিউজ