• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

জ্বালানি তেলের প্রভাবে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কতটা তীব্র ও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল সদ্যবিদায়ি সেপ্টেম্বর মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের পরিসংখ্যানে| অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ বা বৃদ্ধির যে সরাসরি অভিঘাত, তা ইতিমধ্যে বাজারদরের ওপর জোরালো প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে| বিগত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে| এর বিপরীতে সাধারণ শ্রমজীবী ও চাকরিজীবী মানুষের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন মজুরি বৃদ্ধির গতি আশঙ্কাজনকভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে| অর্থনীতির অত্যন্ত সাধারণ অথচ নির্মম বাস্তবতা হলো, বাজারে যখন নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ে এবং সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়ে না, তখন প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়ে জনজীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়| বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথা বিবিএস প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই-এর হালনাগাদ তথ্যে এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের নিখুঁত চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে|

মূল্যস্ফীতির এই ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশের সাধারণ পরিসংখ্যানিক অর্থটি তলিয়ে দেখলে সাধারণ ভোক্তার ওপর ব্যয়ের প্রকৃত বোঝাটি সহজে অনুধাবন করা যায়| এর সহজ অর্থ হলো, ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি পরিবারকে যে পরিমাণ মৌলিক পণ্য বা প্রয়োজনীয় সেবা কিনতে ১০০ টাকা খরচ করতে হয়েছিল, ঠিক একই পরিমাণ পণ্য বা সমমানের সেবা পাওয়ার জন্য ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা| বিবিএসের বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে সার্বিক সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ| মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তা দৃশ্যমানভাবে বেড়ে গিয়ে সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে এসে পৌঁছেছে| অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষার্ধে অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম যে আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারই চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব সেপ্টেম্বর মাসের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হিসাবে জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে|

সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এই ক্ষতিকর প্রবণতার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দর| বিবিএসের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, আগস্ট মাসে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি যেখানে ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ, মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে তা লাফিয়ে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে| সাধারণ মানুষ ও সীমিত আয়ের পরিবারের মোট পারিবারিক আয়ের সিংহভাগই চলে যায় দুই বেলা অন্নসংস্থানের পেছনে| সেই খাদ্যপণ্যের বাজারে যখন এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান হয়, তখন পরিবারগুলোর পুষ্টি ও সঞ্চয় সরাসরি হুমকিতে পড়ে| অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে অবস্থান করছে, যা পূর্ববর্তী আগস্ট মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ| যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত খাতের চাপ এখনো অত্যন্ত বেশি, কারণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ|

দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর বিগত জুলাই ও আগস্ট মাসে তা কিছুটা নিম্নগামী হয়েছিল, যা সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির আশা জাগিয়েছিল| কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে এসে সেই স্বস্তির জায়গাটি পুনরায় উবে গিয়ে নতুন করে দাম বাড়ার তীব্র প্রবণতা ফিরে এসেছে| এর মূল কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে| জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবহন খরচ সরাসরি বেড়ে গেছে| পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান কিংবা স্থানীয় পরিবহনের ভাড়া বাড়ার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ খুচরা পণ্যের ভোক্তাদের| কৃষক বা উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পাইকারি বাজারে এবং সেখান থেকে শহরের খুচরা বাজারে কাঁচামাল ও নিত্যপণ্য পৌঁছাতে পরিবহন ব্যয়ের যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তা পণ্যের চূড়ান্ত খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে| ফলে সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি প্রতিটি সেবামূলক খাতের খরচও একযোগে বৃদ্ধি পাওয়ায় কেবল নিম্নবিত্ত নয়, বরং নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পারিবারিক বাজেট পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে|

দেশের শহর ও গ্রাম—উভয় প্রান্তেই সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির চাবুক সমানে আঘাত হেনেছে| বিবিএসের তথ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামীণ অঞ্চলেও সাধারণ মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ| গ্রামেও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি ছিল তীব্র| সেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৭ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশে| তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রে গ্রামে সামান্য কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে, যেখানে আগস্টের ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশের বিপরীতে সেপ্টেম্বরে তা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে| অন্যদিকে শহরাঞ্চলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির একই রকম চিত্র দেখা গেছে| শহরাঞ্চলে সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা আগস্ট মাসে রেকর্ড হয়েছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ| শহরাঞ্চলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল আরও বেশি আক্রমণাত্মক, যেখানে আগস্টের ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে গিয়ে সেপ্টেম্বরে তা পৌঁছেছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে| বিপরীতে শহরে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে সামান্য হ্রাস পেয়ে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশে অবস্থান করছে| শহরের স্থায়ী বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অপরিহার্য ব্যয়ের চাপে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেঁচে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে|

এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হারে ক্রমাগত স্থবিরতা ও নিম্নগতি| একদিকে বাজারদরের উল্লম্ফন ঘটলেও অন্যদিকে মানুষের শ্রমের মূল্য সেভাবে বাড়ছে না| বিবিএসের তৈরি মজুরি হার সূচক বা ডব্লিউআরআই-এর হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে, অথচ এর আগের মাস আগস্টেও এই বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ| অর্থাৎ, যেখানে বাজারে পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হারে বাড়ছে, সেখানে সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি বাড়ছে মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে| এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মূল্যস্ফীতির গতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে| সাধারণ ভাষায় একেই বলে ‘রিয়েল ইনকাম’ বা প্রকৃত আয়ের মারাত্মক সংকোচন, যার ফলে প্রতিদিন একই পরিমাণ শ্রম দিয়েও মানুষ আগের চেয়ে কম পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে পারছে|

খাতভিত্তিক মজুরি বৃদ্ধির বিশদ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের প্রধান তিনটি উৎপাদনশীল খাতের কোনোটিতেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে অতিক্রম করতে পারেনি| সেপ্টেম্বর মাসে কৃষি খাতে নিয়োজিত বিপুল জনগোষ্ঠীর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ| শিল্প খাতের সাধারণ শ্রমিক ও কর্মীদের মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ হারে| আর সেবা খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশে| প্রতিটি প্রধান খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করলেও তা কোনোভাবেই সার্বিক মূল্যস্ফীতির ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না| ফলে কৃষক, দিনমজুর, পোশাক শ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র চাকরিজীবী—প্রত্যেকটি কর্মজীবী মানুষের পরিবারকেই তাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর উপাদান কাটছাঁট করতে হচ্ছে কিংবা ধারদেনা করে সংসারের ব্যয় মেটাতে হচ্ছে|

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো নিশ্চিত করেছে যে, তাদের এই ভোক্তা মূল্যসূচক ও মজুরি সূচকের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান কোনো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়নি| বরং অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের স্বার্থে সারা দেশের ৬৪টি জেলার নির্বাচিত ১৪৩টি সক্রিয় গ্রামীণ হাট ও শহুরে বাজার থেকে সরাসরি তৃণমূলের পণ্যের দরদাম ও শ্রমিকের মজুরির তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে এই তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করা হয়েছে| ফলে এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক চূড়ান্ত দলিল| বাজার বিশ্লেষকরা তাই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সময় যদি তার বহুমাত্রিক প্রভাব বিবেচনা না করা হয় এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার না করা যায়, তবে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কমিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে|

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category