• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

ডিজিটাল শৃঙ্খল: বিপন্ন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

রিন্টু আনোয়ার / ২ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

-রিন্টু আনোয়ার

ইন্টারনেট ও সাইবার স্পেস আধুনিক মানবসভ্যতায় মানুষের মতপ্রকাশের সবচেয়ে বড়, উন্মুক্ত এবং শক্তিশালী প্রাঙ্গণ। যখন কোনো রাষ্ট্র বা সরকার এই মুক্ত প্রাঙ্গণকে আইনি বেড়াজালের মোড়কে নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা করে, তখন তা কেবল সাধারণ মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার জন্যই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা ডিএসএ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে যে চরম ভীতি, উদ্বেগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটাতে একটি নতুন অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীতে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। তখন সচেতন মানুষের মনে একটি বড় ধরনের আশা জেগেছিল যে, হয়তো এবার নিবর্তনমূলক আইনের কালো ছায়া থেকে বাংলাদেশের সাইবার জগৎ মুক্তি পাবে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে তার মতপ্রকাশের অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর যে নতুন খসড়া প্রকাশ করেছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে চরমভাবে হতাশ হতে হয়। এই খসড়াটি পড়ে যে কারও মনে এই যৌক্তিক প্রশ্নটি জাগতে বাধ্য যে, এটি কি নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত কোনো আইন, নাকি নতুন বোতলে সেই পুরোনো ও কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষাক্ত মদ? এই প্রশ্নটি আজ শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মুখে মুখে প্রবলভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে।

যেকোনো আধুনিক ও গণতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর একটি মৌলিক ও প্রধান শর্ত হলো—সেই আইনের ভাষা হতে হবে সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থহীন, সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট। কিন্তু প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনীতে অত্যন্ত সুকৌশলে বেশ কিছু শব্দগুচ্ছ এবং পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা আইনি কাঠামোর চেয়ে বরং সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার বিশাল ঝুঁকি তৈরি করেছে। খসড়ায় ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ এবং ‘বুলিং’-এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে নতুন করে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। খসড়ায় ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আপাতদৃষ্টিতে সংজ্ঞাটি নিরীহ মনে হলেও এর প্রয়োগের জায়গাটি অত্যন্ত ভয়ংকর। প্রশ্ন হলো, একটি তথ্য ‘অযাচাইকৃত’ কি না, তার চূড়ান্ত মাপকাঠি নির্ধারণ করবে কে? অনেক সময় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতি বা অনিয়মের এমন অনেক তথ্য উঠে আসে, যা তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে স্বীকার করতে চায় না এবং সেগুলোকে সহজেই গুজব বলে উড়িয়ে দেয়। সরকারের বা ক্ষমতাধরদের দৃষ্টিতে যা প্রাথমিকভাবে ‘গুজব’ বলে আখ্যায়িত হয়, কালক্রমে তা-ই যে রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার অসংখ্য নজির আমাদের দেশের ইতিহাসেই রয়েছে। এই অস্পষ্ট ধারার অপব্যবহার করে যেকোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সরকারের নীতিগত কড়া সমালোচনাকে ‘গুজব’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠরোধ করা এখন অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে।

এই ভীতিকর প্রেক্ষাপটেই প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সম্প্রতি সোচ্চার হয়েছে দেশের গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ। সম্পাদক পরিষদ অত্যন্ত সময়োপযোগী ১২ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে, যা প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে—সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা কোনো সরকারি নীতির সমালোচনাকে কোনোভাবেই সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তাদের সুপারিশের প্রথম দফাতেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক সমালোচনা, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কাউকে অপরাধী করা যাবে না। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আইন থেকে অবিলম্বে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

অন্যদিকে ‘অপতথ্য’ বা ভুয়া খবর ছড়ানোর দায়ে খসড়ায় সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড এবং চল্লিশ লাখ টাকা জরিমানার যে বিশাল খড়্গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো এবং সভ্য সমাজের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন নির্দেশনায় বারবার স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ‘মিসইনফরমেশন’ বা ভুল তথ্যের মোকাবিলা কখনোই জেল-জরিমানা দিয়ে করা উচিত নয়, বরং এটি মোকাবিলা করতে হয় অবাধ ও সঠিক তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে। ভুল তথ্যের জন্য এত দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া কোনোভাবেই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে সম্প্রতি ১৯টি সংগঠনের (টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, মহিলা পরিষদ প্রভৃতি) অংশগ্রহণে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত যৌক্তিক একটি দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমের মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। ব্যবসায়িক স্বার্থে মেটা বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সংঘাতমূলক কনটেন্ট বেশি প্রচার করে; তাই অ্যালগরিদমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই বৈঠকে ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, রামু বা মিয়ানমারের মতো ঘটনায় ফেসবুকের অপব্যবহার হয়েছে, অথচ ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই। তিনি প্রস্তাবিত আইনের ২৬(ক) ধারা বাতিল এবং মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, মানহানির ক্ষেত্রে ফৌজদারি জেলের পরিবর্তে দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা উচিত। সম্পাদক পরিষদও তাদের সুপারিশে বলেছে, অনলাইনে মানহানির অভিযোগকে নতুন ও কঠোর সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান কাঠামোয় প্রেস কাউন্সিলে পাঠানো উচিত।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানির শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং বিশ লাখ টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর ভুক্তভোগী যদি নারী বা শিশু হয়, তবে এই শাস্তির পরিমাণ সরাসরি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বিগত সরকারের আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মানহানির শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। অর্থাৎ, নতুন সংশোধনীতে শাস্তির মাত্রাকে কমানোর বদলে আরও অনেক বেশি কঠোর, নির্দয় ও অমানবিক করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘বুলিং’ বা ‘হেয়প্রতিপন্ন’ করার সংজ্ঞাও রাখা হয়েছে অত্যন্ত শিথিল ও অস্পষ্টভাবে। যৌন হয়রানি বা সেক্সটর্শনের মতো প্রকৃত গুরুতর অপরাধ দমনের নামে খসড়ায় যে অপেশাদার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে নিরপরাধ মানুষকে আইনি হয়রানির বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেবে।

গণমাধ্যমকে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যা রাষ্ট্রের অন্যান্য কাঠামোর ওপর নজর রাখে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে। কিন্তু প্রস্তাবিত খসড়ায় সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি অপরাধী সাব্যস্ত করার একটি অভাবনীয় ও ভয়ংকর বিধান যুক্ত করা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, যদি কোনো সংবাদমাধ্যমের কোনো কনটেন্ট বা সংবাদকে কর্তৃপক্ষ ‘ভিত্তিহীন’ বা দেশের অখণ্ডতার পরিপন্থী বলে মনে করে, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স বা নিবন্ধন বাতিল অথবা স্থগিত করার ক্ষমতা আদালতের হাতে থাকবে। একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য এটি আক্ষরিক অর্থেই ‘মৃত্যুদণ্ড’ বা ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেওয়ার সমতুল্য। টিআইবির গোলটেবিল বৈঠকে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব-এর সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সরকারের উদ্দেশে এক কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।” ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, এই অমোঘ সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ চরম অপব্যবহারের জন্ম দেবে। সম্পাদক পরিষদও তাদের নবম সুপারিশে স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো একটি প্রতিবেদনের জন্য পুরো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ বা নিবন্ধন বাতিল করা যাবে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ডিভাইস জব্দের মারাত্মক ঝুঁকি। গত ১৪ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মেলন কক্ষে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় দ্যা ডেইলি স্টারের উপদেষ্টা সম্পাদক কামাল আহমদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকদের ডিজিটাল ডিভাইস বা কম্পিউটার জব্দ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তথ্যসূত্র (News Source) উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। সম্পাদক পরিষদ তাদের দশম সুপারিশে জোর দিয়ে বলেছে, সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কাউকে তার তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা যাবে না। ওই একই সভায় বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ এবং অ্যাটকোর মহাসচিব আব্দুস সালাম মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সাংবাদিকদের ‘Trial and error’-এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং জবাবদিহিহীনতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এই খসড়ার আরেকটি অত্যন্ত ভয়ংকর দিক। খসড়ায় ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে যে অপরিসীম ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের নামান্তর। আগে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিটিআরসির মাধ্যমে কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ করত। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে যেকোনো সন্দেহবশত কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এর প্রতিকারে সম্পাদক পরিষদ তাদের ষষ্ঠ সুপারিশে জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে কোনো ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পর্যালোচনা বা বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ব্লক করার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সাংবাদিকের পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ বা নজরদারির আগে অবশ্যই আদালতের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করতে হবে (দ্বিতীয় সুপারিশ)।

এই আইন প্রয়োগের কাঠামোগত দিকটিও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। খসড়ায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে আটাশ সদস্যের ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত আমলাতন্ত্রের এক নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের প্ল্যাটফর্ম। গোলটেবিল বৈঠকে রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচজন মন্ত্রী, নয়জন সচিব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে গঠিত এই কাউন্সিলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব কোথায়? সরকারের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে কাউন্সিলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ (দ্বাদশ সুপারিশ)। এছাড়া এই আইনের অধীনে কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা আইনের শাসন ও সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, জটিল প্রযুক্তিগত অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে করার আইনি সুযোগ রাখা। রাস্তার মোড়ে বসে একটি মোবাইল কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে ডিপফেক ভিডিও বা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে করা মানহানির বিচার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং সম্পাদক পরিষদ উভয়েই জোরালো দাবি জানিয়েছেন যে, সংবাদ প্রকাশ বা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করা যাবে না; এটি অবশ্যই স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। পাশাপাশি, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সম্পাদক পরিষদ এই বিচারহীনতা বন্ধের যে দাবি তুলেছে, তা প্রমাণ করে যে সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তাও আজ কতটা হুমকির মুখে।

আশার কথা হলো, অংশীজনদের এই তীব্র প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিক দাবির মুখে সরকার কিছুটা নমনীয় অবস্থান প্রদর্শন করেছে। সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রস্তাবিত আইনটি যাতে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তিনি ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহবুব আনামের প্রস্তাব গ্রহণ করে আইনটি নিয়ে আরও নিবিড় আলোচনার জন্য সময় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, সাংবাদিকদের পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার বা তল্লাশির আগে আদালতের পূর্বানুমতি নেওয়ার যে দাবি সম্পাদক পরিষদ ও অন্যান্যরা তুলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেটিকে উপযুক্ত ও যুক্তিযুক্ত মনে করে বিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও)-কে ফোকাল পয়েন্ট করে একটি বিশেষ সমন্বয় কাঠামো গঠনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে, যারা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়ন করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সদিচ্ছাকে আমরা অবশ্যই সম্মান জানাই। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অনলাইনে নারী ও তরুণদের সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ব্ল্যাকমেইল বা চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো ঘৃণ্য অপরাধগুলো কঠোর হাতে দমন করতে হবে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, একটি মশা মারতে গিয়ে কি আমরা পুরো বাড়িতে কামান দাগাব? নারী ও শিশুদের সুরক্ষার ঢাল ব্যবহার করে আইনের ভেতরে এমন সব অস্পষ্ট ধারা সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না, যার প্রধান শিকার হবেন দেশের স্বাধীন সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীরা। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তারাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তীব্র সমালোচনা করেছিল। ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই একই ধরনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো নতুন মোড়কে ফিরে এলে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সাইবার স্পেস এখন আধুনিক মানুষের দ্বিতীয় জীবন। এই ডিজিটাল জীবনকে শৃঙ্খলিত করে কোনো জাতি মেধা ও মুক্তচিন্তায় এগোতে পারে না। প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ যদি নাগরিক সমাজ, সম্পাদক পরিষদ এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের ১২ দফা সুপারিশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তার বর্তমান চেহারায় পাস হয়, তবে তা বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক চর্চার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেবে। সরকারের প্রতি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের বিনীত ও জোরালো আহ্বান—মানহানি বা গুজবের মতো বিষয়কে ক্রিমিনালাইজ করার ঔপনিবেশিক ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের মতো কালাকানুন চিরতরে বাদ দিতে হবে। আইন প্রণীত হোক প্রকৃত সাইবার অপরাধীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য, দেশের সাধারণ নাগরিক ও সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার জন্য নয়। বাংলাদেশের ডিজিটাল ভুবন হোক মতপ্রকাশের এক অবারিত প্রান্তর, নজরদারি ও নিপীড়নের কোনো বদ্ধ খাঁচা নয়। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে নির্ভয়ে নিজের মতপ্রকাশের এইটুকু নিশ্চয়তা পাওয়া আমাদের সবার জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category