• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন
Headline
তিন বছরের বাড়তি সময়: আমরা কি সত্যিই বদলাতে পারব? সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা ঘাড় ব্যথায় কী করবেন? জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ছাত্রদলের দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে: ইশরাক হোসেন মানবিক মূল্যবোধ, পেশাগত দক্ষতা ও সততাই আইনজীবীর প্রধান শক্তি : আইনমন্ত্রী শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, সেবায় রূপান্তরই লক্ষ্য: ফকির মাহবুব আনাম মোংলা বন্দরকে নতুন অর্থনৈতিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে: নৌপরিবহনমন্ত্রী জনতা জুট মিলে ১৭.৮৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্বোধন ইস্তাম্বুল সফরে শিল্পমন্ত্রী: চামড়াশিল্পে তুরস্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ

তিন বছরের বাড়তি সময়: আমরা কি সত্যিই বদলাতে পারব?

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার বা ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’-এর জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ থেকে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তি তিন বছর সময় পেয়েছে বাংলাদেশ। নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত এই বাড়তি সময় দেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ। বর্তমানের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য চ্যালেঞ্জের মুখে এই বর্ধিত সময় আমাদের কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দিচ্ছে। তবে আসল প্রশ্নটি সময়ের পরিমাপ নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এই বাড়তি সময়কে কাজে লাগানোর মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দেখাতে পারবে?
যেকোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া যেমন সুবিধার, তেমনি তা কঠিন ও জরুরি সিদ্ধান্তগুলোকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি অজুহাতও হয়ে উঠতে পারে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলেই ২০১৮ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। পরে করোনা মহামারির ধাক্কা সামলাতে এই প্রস্তুতিমূলক সময় বাড়ানো হয়। এবার মিলল আরও তিন বছর। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন এখানে রয়েই যায়—যে দেশ বারবার নিজের উন্নয়নের প্রমাণ দিচ্ছে, সে কেন সেই অর্জনকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে এত হিমশিম খাচ্ছে?
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যোগ্যতা অর্জন করা আর উত্তরণ-পরবর্তী জীবনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। যোগ্যতা অর্জন আন্তর্জাতিক সূচকের একটি স্বীকৃতি মাত্র। কিন্তু একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং কোনো কোটা বা বিশেষ সুবিধা ছাড়া বিশ্ববাজারে টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর। কয়েক দশক ধরে আমাদের তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বা কোটা সুবিধা পেয়ে আসছে, তা একধরনের স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে। ভয়ের বিষয় হলো, আমাদের ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করার চেয়ে এই বিশেষ সুবিধার ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
একটি মাত্র খাতের ওপর এই অতিরঞ্জিত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। তৈরি পোশাক খাত আমাদের রপ্তানির মূল চালিকাশক্তি হওয়ায় বৈশ্বিক চাহিদা বা ভূ-রাজনীতির সামান্য পরিবর্তনেও পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ওষুধ, চামড়া, কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাতকরণ বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলো এখনো রপ্তানি কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। রপ্তানি বহুমুখীকরণ কেবল মুখে বললেই হবে না, এর জন্য প্রয়োজন সহজ শর্তে ঋণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ শ্রমিক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত পরিবেশ। উদ্যোক্তারা যখন দেখেন গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বা কাস্টমস ও নীতিমালার হয়রানিতে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে, তখন সম্ভাবনাময় খাতগুলোও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের নড়বড়ে দশা। খেলাপি ঋণ, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবে আমাদের আর্থিক খাতের ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। রাজস্ব আদায়ের সংকীর্ণ কাঠামোর কারণে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। কেবল পরোক্ষ কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা চাপালে হবে না, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যৌক্তিক সংস্কার জরুরি। একইভাবে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কেবল ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আর্থিক অনিয়মের কঠোর শাস্তি ও প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া বন্ধের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি মানবিক দিকও রয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আলোচনায় প্রায়শই কেবল রপ্তানি আয় আর শুল্কের হিসাব করা হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন ছাড়া এই অর্জন অর্থহীন। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে শিল্পমালিকেরা যদি কর্মী ছাঁটাই বা মজুরি সংকোচনের পথ বেছে নেন, তবে কর্মক্ষম তরুণ সমাজই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের শিক্ষা ও কারিগরি খাতকে আধুনিক বাজারের উপযোগী করতে হবে, যেন তরুণরা উচ্চ উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ব্যতিরেকে দেশের উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া অসম্ভব।
এই বাড়তি তিন বছর আসলে আমাদের জন্য শেষ সুযোগ। সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্পর্কের সমীকরণটি এখন পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। উচ্চাভিলাষী ঘোষণা আর দুর্বল বাস্তবায়নের বৃত্ত থেকে আমাদের বের হতেই হবে। নীতিনির্ধারকরা যদি এই সময়টিকেও কাঠামোগত সংস্কার না করে স্রেফ পার করে দেন, তবে ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশ এক চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক মাশুল গুনতে বাধ্য হবে। সময় আমাদের হাতে আছে, কিন্তু সদিচ্ছা কি আছে?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category