জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানোর পর এই সময়সীমা দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে বিগত দুই বছরের সেই বর্ধিত সময়েও দেশ কাঙ্ক্ষিত কোনো কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করতে পারেনি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই দ্বিতীয় দফার বর্ধিত সময়প্রাপ্তি কেবল স্বস্তির কোনো বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে হাজির করেছে এক বিরাট ঐতিহাসিক পরীক্ষা ও বড় ধরনের অর্থনৈতিক দায়িত্ব। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি তাদের প্রকাশিত ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে যে এই অতিরিক্ত সময়কে যেকোনো মূল্যে সংস্কার কাজ বেগবান করার কাজে কঠোরভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো দ্বিতীয় সময় বাড়ানোর আবেদন তারা আর কোনোভাবেই সমর্থন করবে না।
দেশের প্রধান উন্নয়ন অংশীদাররাও ইতোমধ্যে জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে বারবার উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী মহলে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়াটির আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশকে মূলত চারটি প্রধান ও অত্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার বদলে নিজস্ব উৎপাদন ও দক্ষতাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে একতরফা সুবিধার পরিবর্তে পারস্পরিকতার সমতার সম্পর্ক তৈরি করা, নীতি প্রণয়নে নমনীয়তার পরিবর্তে কঠোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে কমপ্লায়েন্স বা সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের কঠোর বাস্তবায়ন। অতীতে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে ধরনের বিশেষ সুবিধা বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছি, উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর ঘটলে সেই সুবিধাগুলো ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ উঠে যাবে এবং আমাদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কেবল সময়ক্ষেপণ করে বসে থাকলে পরিস্থিতির কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বরং রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এখনই অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নীতিগত সংস্কার গ্রহণ করা আবশ্যক। দুর্নীতি দমন, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই কেবল দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করা সম্ভব।
এই পরিবর্তিত বিশ্ববাজারের কঠোর বাস্তবতায় নিজেদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সামনে এখন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু সংস্কারমূলক হোমওয়ার্ক রয়েছে। প্রথমত, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে দ্রুত বহুমুখী করার কোনো বিকল্প নেই। এতদিন আমাদের রপ্তানি আয় মূলত নির্দিষ্ট একটি খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল, যা যেকোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী, কম সুদে এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের স্বার্থে সঠিক সময়ে সব ধরনের আর্থিক ও অনার্থিক প্রণোদনা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসা করার খরচ বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি আনা, সামুদ্রিক ও স্থলবন্দরগুলোর দাপ্তরিক ও অপারেশনাল দক্ষতা বহুগুণ বাড়ানো, আধুনিক পরিবহন ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আধুনিক যুগের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগ বা নীতিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়, বরং দেশের বিশাল বেসরকারি খাতকেও এই তিন বছরের সময়সীমাকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের শিল্পকারখানাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে যাতে তারা শুল্কমুক্ত সুবিধার অনুপস্থিতিতেও বৈষয়িক প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। সরকারের হাতে যে অতিরিক্ত তিন বছরের শ্বাস ফেলার সুযোগ বা ব্রিদিং স্পেস এসেছে, তার প্রতিটি মুহূর্ত যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল সংস্কারের পেছনে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় ২০২৯ সালের নির্ধারিত উত্তরণের সময় দেশ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই নতুন সময়সীমা বাংলাদেশকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। যদি সরকার এবং বেসরকারি খাত যৌথভাবে এই তিন বছর সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেয়, তবে উত্তরণ পরবর্তী বিশ্ববাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে এখনই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং একটি প্রতিযোগিতক্ষম ও স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে আমাদের প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার।