• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৪ অপরাহ্ন

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও উন্মত্ত জনতার আস্ফালন: গণপিটুনি বন্ধে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশে একের পর এক সংঘটিত হতে থাকা নির্মম গণপিটুনির ঘটনা সমগ্র বিবেকবান সমাজকে স্তম্ভিত ও শঙ্কিত করে তুলেছে | সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এই নৃশংস উন্মাদনা থামার কোনো লক্ষণ নেই | চলতি মাসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উন্মত্ত জনতার হাতে অন্তত ১৫ জন মানুষের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, কেবল ফাঁকা বুলি বা কাগুজে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী বর্বরতা কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না | সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে জনি ও মো. নিশাত নামের দুই নিরীহ পিকআপ চালককে পিটিয়ে হত্যা করার নারকীয় ঘটনা আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিকেই নির্দেশ করে | এর মাত্র ছয় দিন আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বলে পরিচিত আলম শেখ নামের এক ব্যক্তিকে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় | আইনের প্রতি কোনো ধরনের শ্রদ্ধা বা ভয় না থাকলে একটি সভ্য সমাজের বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন পাশবিক হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে না |

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা এবং সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৬৩টি গণপিটুনির ঘটনায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম | কিন্তু শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সংগৃহীত বাস্তব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন ও এক ভয়ানক চিত্র উন্মোচন করছে | মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, বছরের প্রথম ৯ মাসেই গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭১ জন মানুষ | অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নথিপত্র অনুযায়ী, ৩৯৮টি পৃথক ঘটনায় ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৪০১ জন | সরকারি হিসাবের সাথে স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের এই আকাশ-পাতাল গরমিল প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিটির গভীরতা ও সংকটকে সঠিকভাবে উপলব্ধি বা স্বীকার করতেই ব্যর্থ হচ্ছে |

গত ১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বা মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে গণপিটুনি নির্মূলের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন | কিন্তু মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে না পারায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নিজেদের যেকোনো অপরাধের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছে | দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির চরম ঘাটতিই এই মব ভায়োলেন্স বা সংঘবদ্ধ সহিংসতার সংস্কৃতিকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে | ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তার বিচার প্রক্রিয়া আজও চরম স্থবিরতায় বন্দি | চলতি বছরের মার্চে আদালত ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে | একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এতগুলো মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত আদালতে জমা পড়েনি | যখন অপরাধীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায়, তখন বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়া স্বাভাবিক |

একটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো, সমাজে অপরাধ দমনের নামে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই হিংস্র আচরণকে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে বৈধতা দেওয়ার নির্লজ্জ চেষ্টা চালানো হচ্ছে | যখন কোনো সমাজ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে অপরাধ করে আইনের হাত থেকে পার পাওয়া সম্ভব এবং সহিংসতাকে কেউ সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাবে না, তখন পুরো রাষ্ট্র এক নিয়ন্ত্রণহীন নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হয় | কোনো ব্যক্তি অপরাধী হোক বা নিরপরাধ, তার বিচার করার একমাত্র এখতিয়ার প্রচলিত আদালত ও আইনের | ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা চুরির সন্দেহের মতো অজুহাত তুলে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা স্পষ্টতই একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং সরাসরি ঠান্ডা মাথার নরহত্যা |

আমরা মনে করি, সরকারের এখনই সময় এসেছে তাদের মৌখিক অঙ্গীকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপে রূপান্তর করে আইনের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার | গণপিটুনির প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে | একই সাথে সরকারি হিসাবের সাথে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে সমস্যার প্রকৃত বিস্তারকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন | শুধুমাত্র পুলিশি তৎপরতা দিয়েই এই উন্মাদনা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না, এর জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো অত্যন্ত জরুরি | সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, কোনো সন্দেহ বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই | নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এই বর্বরতা বন্ধের একমাত্র পথ |


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category