দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা যেন কোনোভাবেই থামছে না। পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। চাহিদামতো তেল তো মিলছেই না, উল্টো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই সংকটের সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে মজুতদারদের এক বিশাল চক্র। শুধু পাড়া-মহল্লায় নয়, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও (অনলাইন) চড়া দামে জ্বালানি তেল বিক্রির রমরমা কালোবাজারি শুরু হয়েছে।
ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন ও চড়া দামে তেল বিক্রি
পাম্পে যেখানে এক লিটার তেল পেতে মানুষকে রাত পার করে দিন করে ফেলতে হচ্ছে, সেখানে ফেসবুক মার্কেটপ্লেসসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্যেই তেলের চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে একটি চক্র। অনলাইনে ক্রেতা সেজে অনুসন্ধান করে জানা যায়, প্রতি লিটার অকটেন বা পেট্রোল তারা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত হাঁকাচ্ছে।
অনলাইনের এক বিক্রেতা জানান, পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে তাদের বিশেষ সখ্য থাকার সুবাদে তারা চাহিদামতো অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করতে পারেন। এরপর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বা মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগসহ রাজধানীর নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে সেই তেল চড়া দামে এবং সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। অফিস শেষে পাম্পে তেলের সংকট চরম আকার ধারণ করে, আর ঠিক সেই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে এই অনলাইন চক্রটি।
ভবিষ্যতের শঙ্কা ও অভিনব মজুত বাণিজ্য
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজারগুলোতেও ড্রামে করে অবৈধভাবে খোলা তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাম্পগুলো ঘুরে জানা যায়, চালকদের একটি অংশ ভবিষ্যৎ সংকটের শঙ্কায় তেল মজুত করছেন।
তবে এর চেয়েও ভয়ানক বিষয় হলো, অনেকেই এটিকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। এক শ্রেণির অসাধু বাইকার সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে এক পাম্প থেকে তেল নিচ্ছেন, এরপর সেটি নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে রেখে পুনরায় অন্য পাম্পের লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। এভাবেই পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে তারা চড়া দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বা অনলাইনে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
পাম্পে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার লাইন, চরম হাহাকার
রাজধানীর পাম্পগুলোর বর্তমান চিত্র রীতিমতো ভয়াবহ। বিজয় সরণি, মহাখালী, রাজারবাগ, আরামবাগ, মতিঝিল ও আসাদগেটের পাম্পগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, তেলের লাইনের কারণে মূল সড়কগুলোতে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
আগের দিন মধ্যরাত বা ভোরবেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পরদিন দুপুর পর্যন্ত তেলের দেখা পাচ্ছেন না শত শত চালক। ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা একটানা লাইনে দাঁড়িয়ে রাইডশেয়ারিং চালক, চাকরিজীবী ও ফুড ডেলিভারি কর্মীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীব্র রোদে তাদের শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি কাটাতে অনেক চালককে বাইকের ওপর বসেই দলবেঁধে লুডু খেলে সময় পার করতে দেখা গেছে। আবার ১৫-১৬ ঘণ্টা অপেক্ষার পর সিরিয়াল পাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাম্পের তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় খালি হাতে ফেরার হতাশাজনক ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন
পাম্পগুলোতে যানবাহনের এই অস্বাভাবিক চাপ এবং চালকদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভের কারণে অনেক জায়গায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আরামবাগ, মতিঝিলসহ বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে। লাইনের বাইরে থেকে অবৈধভাবে তেল নেওয়ার চেষ্টা করলে বা কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সরিয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে সিন্ডিকেটের কালোবাজারি এবং অন্যদিকে সরবরাহ ঘাটতির কারণে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা একপ্রকার অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।