২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ৩৬ দিনের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটাতে যেসব রাজনৈতিক শক্তি রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, ঠিক দুই বছরের মাথায় এসে সেই মিত্রদের সম্পর্কের সমীকরণে বড় ধরণের ফাটল দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে জাতীয় ঐক্যের বার্তা তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের ব্যবধানে তীব্র রাজনৈতিক অনাস্থা, মতাদর্শিক দূরত্ব এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে ফিকে হয়ে গেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের কথা স্বীকার করলেও এর পেছনে ক্ষমতা, নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্বাচনী রাজনীতির সংঘাতকে দায়ী করছেন। রাজপথের আন্দোলন পেরিয়ে সরকার গঠনের পর থেকে এই অনৈক্য ও বাকযুদ্ধ ক্রমশ প্রকাশ্যে এসে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করছে।
বিদ্যমান এই দূরত্বের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সরাসরি ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের মতে, রাজপথের গণ-অভ্যুত্থানের পর মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোট’ ইস্যুতে যে ধরনের ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল, নির্বাচনের পর সরকার পরিচালনার পদে এসে বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বিষয়টি স্পষ্ট করে জানান যে, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব মৌলিক ইস্যুতে তারা একসাথে শুরু করেছিলেন, নির্বাচনের পরে নীতিগত পরিবর্তন আনায় দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ কারণে রাজপথে এবং জাতীয় সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে জামায়াতকে জনগণের বড় একটি অংশকে সাথে নিয়ে সোচ্চার হতে হচ্ছে, যার স্বাভাবিক পরিণতি এই বিভাজন।
অন্যদিকে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই রাজনৈতিক বিরোধকে ক্ষমতা ও আদর্শিক লড়াইয়ের এক স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে করছে। এনসিপির মতে, ফ্যাসিবাদ পতনের পর রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে কিংবা জনকল্যাণে কোনো পুরোনো রাজনৈতিক দলই যুগোপযোগী ও শক্তিশালী চিন্তাভাবনার প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেনি। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া মনে করেন, দলগুলোর মধ্যে মূল কোন্দল তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় আধিপত্য বিস্তার এবং নিজস্ব পুরোনো মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করাকে কেন্দ্র করে। তারা সতর্ক করেছেন যে, রাজপথের মিত্রদের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বিভেদ ও অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ বা অশুভ রাজনৈতিক শক্তি পেছন থেকে দরকষাকষির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনে করছে, একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমালোচনা থাকা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। তবে সেই সমালোচনা বা রাজনৈতিক বিরোধিতা নির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক সীমার মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গণতন্ত্রে সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা ও কর্মসূচি পালনকে সব সময় স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু তা না করে যদি কোনো পক্ষ জোরজবরদস্তিমূলক অবস্থান নেয় কিংবা সব সিদ্ধান্ত নিজেদের মতো চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি কায়েম করতে চায়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ধরনের চরম অবস্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতা রাজপথের আন্দোলনে পরাজিত শক্তিকেন নানা ছদ্মবেশে আবার ফিরে আসার পথ তৈরি করে দিতে পারে বলে দলটি মনে করছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের তোপ সামলাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিরোধীরা ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কঠোর ভাষায় সরকারবিরোধী বক্তব্য দিলেও বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সহনশীলতা ও ধৈর্য প্রদর্শন করে চলেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যেও তা উঠে এসেছে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করতে না দেওয়ার কিংবা জোর করে পতন ঘটানোর হুমকি স্বৈরাচারী মানসিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। বিপরীতে, বিরোধী শিবিরে থাকা জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা জনগণের অধিকার এবং অভ্যুত্থানের মূল চেতনা রক্ষায় নতুন আন্দোলনের ডাক দিয়ে রাজপথে নামার হুঙ্কার দিচ্ছেন। ফলে দুই বছর আগে যে রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল, আজ তারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশকে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক আবর্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।