ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে দেখলেন, পিঠ ও কোমর একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। টানা ৩০ মিনিট ধরে কোমর নাড়ানোই দায়। হাঁটাচলা প্রায় অসম্ভব। বিশ্রাম নেওয়ার সময়ে এ ব্যথা আরও বাড়ে, খিঁচুনি ধরে পিঠ ও কোমরের নীচের অংশে। এ ব্যথাকে সাধারণ বাত ভেবে ফেললে ভুল হবে। আবার সাধারণ স্পন্ডিলাইটিসের ব্যথাও নয়। যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের খুব তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। কারণ, এই রোগটি স্পন্ডিলাইটিসের এক বিরল ধরন যার নাম অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিস। এটি এক ধরনের অটোইমিউন রোগ, যা কমবয়সিদেরই বেশি হয়।
কী এই অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিস?
মেরুদণ্ড এবং কোমর ও নিতম্বের সংযোগস্থলে দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক ব্যথা হয়। চিকিৎসকেরা বলেন, মেরুদণ্ডের বাত। অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিস কেবল হাড় বা পেশির ক্ষয়জনিত রোগ নয়, এটি হাড়ের তীব্র প্রদাহজনিত অবস্থা। দীর্ঘদিন এই প্রদাহ অবহেলিত থাকলে মেরুদণ্ডের হাড়ের কশেরুকাগুলি একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। ফলে মেরুদণ্ডের নমনয়তা নষ্ট হবে। পিঠ, কোমর ও নিতম্বের উপরের অংশের পেশি আড়ষ্ট হয়ে যাবে। এতে হাঁটাচলা ও ওঠাবসা করতে কষ্ট হবে। রোগী সামনে ঝুঁকতে পারবেন না। এমনকি এই ধরনের স্পন্ডিলাইটিস হলে আক্রান্ত হতে পরে হিপ জয়েন্টও।
অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিসের উপসর্গ দেখা দেয় তরুণ বয়সেই। ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সে রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, যাঁরা একটানা বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাঁদের এমন রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে বসে মোবাইল বা টিভি দেখলে, চেয়ারে ঝুঁকে বসে কম্পিউটার বা ল্যাপটপে টানা কাজ করলে, এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তবে এটি যেহেতু অটোইমিউন রোগ, তাই যে কোনও কারও হতে পারে যে কোনও সময়ে। এর সঙ্গে জিনগত যোগসূত্রও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।
জিনের সঙ্গে যোগ
অটোইমিউন রোগে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই শরীরের শত্রু হয়ে যায়। এর নেপথ্যে আবার কলকাঠি নাড়ে বিশেষ কিছু জিন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, রোগটির জন্য প্রধানত ‘এইচএলএ-বি২৭’ নামক একটি বিশেষ জিন দায়ী। ৯০-৯৫ শতাংশ অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিসের আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এই জিনটি পাওয়া গিয়েছে। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, এই জিনে যদি রূপান্তর (মিউটেশন) ঘটে, তা হলে রোগটি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
স্পন্ডিলাইটিসের এই বিশেষ ধরনে শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যেতে পারে। পিঠ ও কোমরে ব্যথা তো হয়ই, পাশাপাশি পেটে ব্যথা, চোখ লাল হয়ে ফুলে ওঠার মতো উপসর্গও দেখা দেয়। অনেক সময়েই একে সাধারণ সংক্রমণ ভেবে এড়িয়ে যান অনেকেই। প্রাথমিক লক্ষণগুলি সাধারণ বলেই ভ্রম হয়। তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, রোজ যদি ঘুম থেকে ওঠার সময়ে পিঠ ও কোমর আড়ষ্ট হয়ে যায়, ঘণ্টাখানেক ধরে তা চলতে থাকে এবং গোড়ালিতে যন্ত্রণা, বুকে চাপ চাপ ব্যথা, চোখ জ্বালা করার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তা হলে সতর্ক হতে হবে। রোগ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারও করতে হতে পারে।