বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমানে যে নজিরবিহীন সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কেবল বিগত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘদিনের অব্যवस्था ও দুর্নীতির একক ফল নয়। বরং পরবর্তীতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশ কিছু অদূরদর্শী ও ঢালাও নীতিগত সিদ্ধান্ত এই অনটনকে আরও গভীর ও সংকটময় করে তুলেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন রদ করার অজুহাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা হয়, যা দেশের বর্তমান গ্যাস ঘাটতি ও বিদ্যুৎ লোডশেডিংকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। নীতিনির্ধারকদের এই প্রাতিষ্ঠানিক ভুলের ফলে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নির্বাচিত সরকারকে বৈশ্বিক বাজারের উত্তাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই বাতিল করা হয়েছিল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতের ৩১টি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যা বাস্তবায়িত হলে চলতি বছরেই জাতীয় গ্রিডে অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। এর পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে স্বাক্ষরিত ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চুক্তি ও ১৫ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহ চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করা হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ এই চুক্তিগুলো পুরোপুরি বাতিল না করে সরকারের পুনঃদরকষাকষি বা রিনেগোশিয়েট করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের ফলে চলতি অর্থবছরে বহুল প্রত্যাশিত গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ নেওয়া এসব সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সবুজ শক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে, যেখানে শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগ যুক্ত ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে সার্বভৌম গ্যারান্টি বা ‘সভরেন গ্যারান্টি’ থাকা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট বিকল্প না রেখে প্রকল্পগুলো বাতিল করায় বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ১৮ মাসের মেয়াদে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধিসহ স্থানীয়ভাবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান বা উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। উপরন্তু, বিদ্যুতের একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিপিডিবি-র আর্থিক লোকসান আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশে স্বাভাবিক চাহিদার বিপরীতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের তীব্র ঘাটতি বিদ্যমান। বিদ্যমান টার্মিনালের কারিগরি ট্রুটি এবং নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ স্থগিত থাকায় কলকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ফলে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক, সিরামিক ও ইস্পাত শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হোঁচট খাচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে জ্বালানি ক্রয়ের ফলে সরকারের বাজেটে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।
দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন যে, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই ধ্বংসস্তূপ রাতারাতি মেরামত করা সম্ভব নয়। তবে সরকার ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে গ্যাস আমদানির কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে এবং বাতিল হওয়া সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোকে পুনর্মূল্যায়ন করে দ্রুগতি দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক রাখা এক কঠিন পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।