• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন
Headline
নবীজির স্মৃতিধন্য জলপাই বাগান দখলে ইসরাইলিরা যত্ন অর্থনীতি বা ‘কেয়ার ইকোনমি’: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৩ এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার

আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা ভাবছে সরকার

Reporter Name / ৫৫ Time View
Update : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বহুজাতিক কোম্পানির উন্মুক্ত কয়লাখনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে রক্ত ঝরার বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে সেই পুরোনো বিতর্কের ভূত নতুন করে তাড়া করতে শুরু করেছে দেশকে। রক্তাক্ত সেই প্রতিরোধের দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যখন ফুলবাড়ীর আত্মদানকে স্মরণ করছেন, ঠিক তখনই জাতীয় জ্বালানি সংকট মেটানোর অজুহাতে সরকারের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা পুনরায় খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জনবসতি, কৃষিজমি এবং ভূগর্ভস্থ অমূল্য পানিসম্পদ ধ্বংস করে মাটির গভীর থেকে কয়লা তোলার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গজুড়ে নতুন করে প্রতিরোধের আগুন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা এবং শিল্প-কারখানায় চলমান তীব্র অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার দেশীয় কয়লা সম্পদের ওপর পুনরায় নজর দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় সম্মেলনে সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে বলে মন্তব্য করার পর থেকেই দেশজুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জাতীয় সংসদে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের একটি সমন্বিত রূপরেখা সম্বলিত দশ বছর মেয়াদি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল, যা এখন আরও প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।

তবে সরকারের এই অবস্থানকে স্পষ্ট গণবিরোধী এবং পরিবেশের জন্য আত্মঘাতী বলে আখ্যা দিয়েছেন ফুলবাড়ী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। ঢাকা থেকে দিনাজপুর অভিমুখে শুরু হওয়া এক সংহতি রোডমার্চে অংশ নিয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান যে, নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভাবছেন দীর্ঘ সময়ে মানুষ অতীত সংগ্রাম ভুলে গেছে, কিন্তু জনগণের প্রতিরোধের মনোভাব এতটুকুও দুর্বল হয়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট যুক্তরাজ্যভিত্তিক এশিয়া এনার্জির (বর্তমান গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট রিসোর্সেস) আগ্রাসী উন্মুক্ত খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আমিন, সালেকিন ও তরিকুল নামের তিন বীর তাজা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন এবং বহু মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন। সেই সময়কার সরকার রক্তাক্ত ওই গণবিক্ষোভের মুখে ৩০ আগস্ট উন্মুক্ত কয়লাখনির পরিকল্পনা চিরতরে বাতিল ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বহিষ্কার করার সুস্পষ্ট ছয় দফা ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিল।

ভূতত্ত্ব ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ, উর্বর কৃষিনির্ভর এবং নাজুক প্রতিবেশের দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা চরম এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা প্রকল্পের (আইএপি) গবেষণায় স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, ফুলবাড়ীতে মাটির উপরিভাগ কেটে কয়লা তুলতে গেলে খনি এলাকাকে পানিশূন্য রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ পানি পাম্প করে তুলে ফেলে দিতে হবে। এর সরাসরি ফল হিসেবে আশপাশের শত শত কিলোমিটার এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর চিরতরে নিচে নেমে যাবে এবং সব নলকূপ শুকিয়ে গিয়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গে তীব্র সুপেয় পানি ও সেচের সংকট তৈরি হবে। ইতিপূর্বে বড়পুকুরিয়ার ভূগর্ভস্থ খনির প্রভাবেই পার্শ্ববর্তী অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ মিঠাপানির অধিকার সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন।

জাতিসংঘের বিশদ সামাজিক ও পরিবেশগত পর্যালোচনা প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি বাস্তবায়িত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ নিজেদের আদি বসতভিটা থেকে সরাসরি উচ্ছেদ হবেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি সাধারণ নাগরিক। শুধু তা-ই নয়, এই প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত প্রায় ১২ হাজার হেক্টর উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমি সম্পূর্ণ মানচিত্র থেকে মুছে যাবে, ধ্বংস হবে সহস্রাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম মৎস্য খামার এবং কেটে ফেলা হবে প্রায় অর্ধলক্ষ ফলদ বৃক্ষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমামের মতে, প্রবল বর্ষা ও তীব্র ভূমিস্বল্পতার এই দেশে উন্মুক্ত খনি পরিচালনা করা প্রযুক্তিগতভাবেই এক অসম্ভব কল্পনা। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, মাটির গভীর থেকে কয়লা তোলার জন্য মূল খনির চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ আয়তনের অতিরিক্ত জায়গা প্রয়োজন কেবল খুঁড়ে তোলা লাখ লাখ টন মাটি ও বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার জন্য। তদুপরি, ভারী বর্ষার মৌসুমে বিশাল এই উন্মুক্ত গহ্বর কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না; এটি একটি অস্থিতিশীল ও বিষাক্ত কৃত্রিম জলাশয়ে রূপ নেবে, যা আশপাশের সমগ্র অঞ্চলের মাটির ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোকে চিরতরে দুর্বল ও ধসের মুখে ঠেলে দেবে। এই ধরনের মারাত্মক ঝুঁকির কারণেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খনি প্রতিষ্ঠান বিএইচপি বিলিটন একসময় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান বজায় রাখা অসম্ভব বিবেচনা করে এই প্রকল্প থেকে স্বেচ্ছায় নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল।

বর্তমানে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে মেটানো হচ্ছে, যার সিংহভাগ কয়লাই চড়া মূল্যে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য সচিব হাসান মেহেদী মনে করেন, আমদানির বিকল্প হিসেবে উন্মুক্ত খনি চালুর চিন্তা অর্থনৈতিকভাবে কোনো স্বস্তি আনবে না, বরং আর্থিক ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়া থেকে এক টন কয়লা তুলতে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় ১৭৬ ডলার, সেখানে বিশ্ববাজারে কয়লার দাম এখন অনেক কম। উন্মুক্ত খনির ক্ষেত্রে নতুন জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বিশাল ক্ষতিপূরণের বিশাল দায় যুক্ত হলে স্থানীয় কয়লার উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্বব্যাপী যেখানে কয়লাভিত্তিক দূষণকারী জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে উন্নত দেশগুলো, সেখানে রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তি ভঙ্গ করে আবারও সেই ধ্বংসাত্মক উন্মুক্ত কয়লাখনির পথে হাঁটার চিন্তা নীতিগত দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। স্থানীয় জনসাধারণ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের কৃষিজমি ও প্রাণপ্রকৃতি ধ্বংস করে কোনো করপোরেট স্বার্থ বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। মানুষের জীবন-জীবিকা আর পরিবেশকে বিসর্জন দিয়ে কয়লা উত্তোলনের যেকোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশকে আরেক দফা রক্তক্ষয়ী সামাজিক সংঘাতের দিকেই ঠেলে দেবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category