দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন, অর্থায়ন এবং কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির সাম্প্রতিক এক গভীর গবেষণা প্রতিবেদন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। টিআইবির প্রকাশিত এই গবেষণায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক কোটি কোটি টাকার বিশাল সাংগঠনিক ব্যয় এবং এর বিপরীতে আয়ের উৎস নিয়ে অত্যন্ত জোরালো প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত টিআইবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। ২০০৮ সাল থেকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং ক্ষেত্রবিশেষে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখা একটি রাজনৈতিক দলের কেবল কার্যালয় পরিচালনা এবং নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে প্রায় তিন শ দুই থেকে তিন শ তিরানব্বই কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। আর যদি দলগুলোর সাংগঠনিক শাখা একেবারে তৃণমূল তথা ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, তবে তাদের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ এক হাজার পাঁচ শ বত্রিশ কোটি টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার এক শ আটাত্তর কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে এই সম্ভাব্য বিশাল ব্যয়ের ব্যবধান কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না, যা দলগুলোর অর্থের প্রকৃত উৎস নিয়ে গভীর রহস্যের জন্ম দিচ্ছে।
গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি সুনির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের আইনি শর্ত পূরণ করার জন্য ন্যূনতম ছাব্বিশটি জেলা এবং এক শ একটি উপজেলায় কার্যালয় ও কার্যক্রম পরিচালনা করতেই একটি রাজনৈতিক দলের বছরে প্রায় চৌদ্দ থেকে বিশ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। কিন্তু সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন স্তরে কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে সেই খরচ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণ সদস্যদের নিয়মিত মাসিক বা বার্ষিক চাঁদা থেকে জোগান দেওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। গবেষণায় হিসাব কষে দেখানো হয়েছে যে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে কেবল সদস্য চাঁদা থেকে সর্বসাকুল্যে প্রায় এক শ ষোলো কোটি টাকার মতো আয় হতে পারে, যা মোট খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
সদস্য চাঁদার ওপর দলগুলো নির্ভরশীল না থাকলে তাদের এই হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল ঠিক কোথা থেকে আসে, তা নিয়ে টিআইবি তীব্র প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক উৎসের অতিরিক্ত প্রাধান্য দলগুলোকে দেশের বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের ওপর পরনির্ভরশীল করে তুলছে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার এই বর্তমান ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা মূলত প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতার এক দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। এর ফলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে জনকল্যাণমুখী আদর্শ থেকে সরে এসে একপ্রকার ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বা বিজনেস মডেলে রূপান্তরিত হচ্ছে বলে গবেষকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ সবকিছুই এখন অতিমাত্রায় অর্থনির্ভর হয়ে পড়েছে। অর্থায়নের এই ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার ফলে রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, কালো টাকার অনৈতিক প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব মারাত্মকভাবে বিকশিত হচ্ছে। বিত্তশালীদের অনুদান বা পৃষ্ঠপোষকতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দলগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণ কর্মী ও আদর্শবান নেতাদের মতামত উপেক্ষিত হয় এবং পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির পথ আরও বেশি সুগম হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নীতিমালা পর্যালোচনায় গবেষণায় অত্যন্ত হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। অনেক দলের নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক নীতিমালা বা কার্যপ্রণালি বিধিই নেই। দলগুলোর নিজস্ব গঠনতন্ত্রে সদস্যদের পদভেদে চাঁদার সুনির্দিষ্ট হার, অনুদান গ্রহণের পরিষ্কার শর্ত, মনোনয়ন ফরম বিক্রির ফি, হিসাব সংরক্ষণ পদ্ধতি, আর্থিক লেনদেন, কেনাকাটা, নিরীক্ষা বা আর্থিক জবাবদিহি সংক্রান্ত বিধানগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দুর্বল। এছাড়া দলগুলো নিয়মিতভাবে কোনো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না এবং তাদের প্রকৃত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের কোনো নিরীক্ষিত প্রতিবেদন দল বা নির্বাচন কমিশন কারোর পক্ষ থেকেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোতে চরম ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে তাদের দলীয় প্রধান নির্বাচন করে থাকে, তবে সেই নির্বাচনগুলো কখনোই গোপন ব্যালটে অবাধ ভোটের মাধ্যমে হয় না, বরং নামমাত্র কণ্ঠভোটে তা সম্পন্ন করা হয়। দলীয় প্রধানের শীর্ষ পদে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন পাওয়ার কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা বা সংস্কৃতি বর্তমান দলগুলোতে নেই বললেই চলে। গবেষণার আওতায় আসা দশটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে কেবল দুটিতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ার তথ্য মিলেছে। এছাড়া বারটি দলের প্রধান গত দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে একই পদে একচ্ছত্রভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বেশিরভাগ দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি নিজ জীবনে সর্বোচ্চ কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বাধ্যবাধকতামূলক সীমা নির্ধারণ করা নেই। ফরমালি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন কাঠামো কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সমস্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে ব্যক্তিনির্ভর ও স্বৈরাচারী কায়দায় নেওয়া হয়। এমনকি তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদকাল এবং একটি দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্রেই উল্লেখ নেই। ষোলটি রাজনৈতিক দলের জাতীয় কাউন্সিল অত্যন্ত অনিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই কাউন্সিলে সাধারণ কর্মীরা মতামত দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই আগে থেকে নির্ধারিত ও সিলগালা করা সিদ্ধান্তগুলো কেবল অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়।
নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও অর্থ ও বিত্তপ্রভুর প্রভাব যে কতটা অপ্রতিরোধ্য, তা গবেষণার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্তগুলো অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে। মাত্র ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থীর জনপ্রিয়তার কথা বলা হলেও সেগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ মাপকাঠি নেই। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার সময় অর্থ, বিত্তপ্রভুত্ব এবং বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের সর্বাচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার চিত্র পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রধান প্রভাবশালী তিনটি দলে প্রার্থী বাছাই ও চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ওপেন মনোনয়ন-বাণিজ্য হওয়ার গুরুতর অভিযোগও গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্লেষণ করে গবেষক দল দেখতে পেয়েছে যে সংসদ সদস্যদের একটি বিশাল অংশই মূলত ব্যবসায়ী এবং তাদের উপস্থিতি প্রতিবারই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসার এই অনৈতিক ও গভীর সখ্য দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে মন্থর করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এই দুর্বৃত্তায়ন ও ব্যক্তিনির্ভরতার জাল থেকে মুক্ত করতে হলে অবিলম্বে কাঠামোগত ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বলে টিআইবি জোরালোভাবে মন্তব্য করেছে।
এই সামগ্রিক সংকট উত্তরণের জন্য টিআইবির পক্ষ থেকে গবেষণার শেষাংশে মোট বারো দফা সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী সুপারিশমালা পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন বিধিমালাগুলোর যুগোপযোগী সংশোধন করা, রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক হিসাব কঠোরভাবে যাচাই ও তদারকি করা। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে দলগুলোর সমস্ত আর্থিক লেনদেন বাধ্যতামূলকভাবে নিরীক্ষা করা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি স্তরের নেতৃত্ব গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন করার দাবি জানানো হয়েছে।
দলীয় প্রধানসহ যেকোনো নেতৃত্বস্থানীয় পদে একই ব্যক্তির টানা দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও সুপারিশমালায় বলা হয়েছে। ড ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বলেছেন যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মূল দায়িত্ব দলগুলোকেই সবার আগে নিতে হবে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং সাধারণ জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য দলগুলোকে নিজেদের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে টিআইবির এই ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদনটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অস্বচ্ছ অর্থব্যবস্থার একটি নিখাদ চিত্র জাতির সামনে উন্মোচন করেছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে দেশের গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারে না।
আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলো এই গঠনমূলক সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর