• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪০ অপরাহ্ন

ইরানে নতুন হামলার ছক কষছে ইসরায়েল

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে এবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তেহরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত জেরুজালেম। তবে এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত বা নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কান পাবলিক ব্রডকাস্টারের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, জেরুজালেমের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকদের ধারণা অনুযায়ী আগামী বেশ কিছুদিন আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে এই বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্টও জেরুজালেমের একটি উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, আগামী দিনে ইরানের ওপর মার্কিন বাহিনীর যেকোনো সামরিক অ্যাকশনে সরাসরি অংশ নিতে এবং প্রয়োজনে তেহরানের বিরুদ্ধে পুরোদমে একটি সম্মুখ যুদ্ধ শুরু করতে প্রবল আগ্রহী ইসরায়েলি প্রশাসন।

ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হামলা শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসরায়েলি সেই শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, কৌশলগত প্রয়োজন দেখা দিলেই তারা যেকোনো মুহূর্তে আবারও শত্রুর ওপর আক্রমণ করতে শতভাগ প্রস্তুত। ওই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েল অতীতের সেই চরম আতঙ্কের দিনগুলোতে আর কখনো ফিরে যেতে চায় না, যখন তেহরানের ছোড়া মিসাইল ও ড্রোনের আঘাতে অবিরাম সাইরেনের শব্দে সাধারণ ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রাণভয়ে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে বা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হতো। তবে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলেও বর্তমানে ইরানের মাটিতে যা কিছু ঘটছে, তা কেবল এক নীরব ও নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে হাত গুটিয়ে এড়িয়ে যাওয়াও জেরুজালেমের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সুতরাং, এই নতুন সামরিক দ্বৈরথের কারণে যদি ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে চরম মূল্যও চোকাতে হয়, তবে তারা যেকোনো ধরনের কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মেনে নিতে সম্পূর্ণ তৈরি আছে।

নিউইয়র্ক পোস্টের বিশেষ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পূর্বের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ‘সম্পূর্ণ শেষ’ হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর ওয়াশিংটন যদি সামরিকভাবে তেল আবিবের সাহায্য কামনা করে, তবে ইরানের ওপর পরবর্তী মার্কিন হামলায় যৌথভাবে যোগ দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স। জেরুজালেমের একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক সূত্র দাবি করেছে যে, বিগত দিনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সঙ্কটে ইসরায়েল একাধিকবার প্রমাণ করেছে যে তারা সবসময় আমেরিকার বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই যৌথ হামলায় আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক বা কৌশলগত কোনো স্বার্থ আছে কি না তা নিশ্চিত না হলেও, ইসরায়েলের সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে শত্রুকে দমনে এখন তাদের নিজেদের চরম পেশিশক্তি ও আধুনিক সমরাস্ত্রের কার্যকারিতা দেখানোর উপযুক্ত সময় এসেছে।

আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের বর্তমান নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় বুধবার ইরানের ওপর দ্বিতীয় দিনের মতো বড় ধরনের হামলার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে ‘নিকৃষ্ট’, ‘শয়তান’, ‘উন্মাদ’ এবং ‘অসুস্থ মানসিকতার মানুষ’ বলে নজিরবিহীন ও তীব্র ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। ট্রাম্পের এই সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই ওই দিন সন্ধ্যায় ইরানের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ৯০টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানে মার্কিন বিমান বাহিনী, যা এর আগের দিন মঙ্গলবারের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুর চেয়েও সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। মার্কিন পেন্টাগনের এই বিধ্বংসী লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় মূলত ছিল ইরানের শক্তিশালী মিসাইল ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ড সেন্টার, অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার স্টেশন এবং সামরিক রসদ সরবরাহের অন্যতম মেরুদণ্ড রেলপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

আমেরিকার এই অতি সাম্প্রতিক ও বিধ্বংসী হামলার নতুন দফায় ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরাসরি সশরীরে অংশ নেয়নি। তবে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এক হুংকার দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পরিস্থিতি যদি দাবি করে, তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তৃতীয়বারের মতো এবং আগের চেয়েও অন্তত দ্বিগুণ ধ্বংসাত্মক শক্তি নিয়ে সরাসরি ইরানের বুকে আঘাত হানতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। অবশ্য জেরুজালেমের কূটনীতিকেরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ইসরায়েল দেশের মানুষকে আবারও সাইরেন শুনে বাঙ্কারে বা অন্ধকূপের মতো আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাওয়ার সেই অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়। যুদ্ধের শুরুর দিকের দিনগুলোতে তেহরান যেভাবে ইহুদি রাষ্ট্রটির ওপর আকাশপথে নিয়মিত ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালাচ্ছিল, সেদিকের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করেই মূলত এই সতর্ক মন্তব্য করা হয়েছে।

তবে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকেরা এ-ও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তেহরানের পরমাণু ও সামরিক আগ্রাসনকে তারা কোনোভাবেই চোখের সামনে উপেক্ষা করতে পারেন না। তাই এই যুদ্ধের জন্য যদি তাদের কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়, তবে তারা সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৈরি। আমেরিকার এই নতুন ও আগ্রাসী হামলা নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিাহু এখনও জনসমক্ষে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য না দিলেও, গত মাসেই তিনি এক রাষ্ট্রীয় ভাষণে দৃঢ় ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের ওপর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বা হুমকি দেখা দিলেই তারা সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে হামলা চালাবে। তেহরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন এই কড়া হুমকির পর বুধবার রাতেই প্রধানমন্ত্রী নেতানিাহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ আইডিএফ-এর শীর্ষ জেনারেলদের নিয়ে এক বিশেষ জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকে বসেন। একজন উচ্চপদস্থ ইসরায়েলি কর্মকর্তা এই অতি গোপনীয় বৈঠকের খবরটি নিশ্চিত করলেও আলোচনার মূল বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এই সম্ভাব্য মহাযুদ্ধকে সামনে রেখে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের সমগ্র সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক বা রেড অ্যালার্ট অবস্থায় রয়েছে। ইসরায়েলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আই২৪ নিউজ বৃহস্পতিবার তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আইডিএফ-এর সেন্ট্রাল গোয়েন্দা ইউনিটগুলো অনবরত ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরানের সম্ভাব্য নতুন নতুন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রতি মুহূর্তে হালনাগাদ করে চলেছে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে এক ‘নিবিড় ও চব্বিশ ঘণ্টার অপারেশনাল সমন্বয়’ বজায় রাখছে, যাতে ট্রাম্পের চূড়ান্ত নির্দেশ বা গ্রিন সিগন্যাল আসামাত্রই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানের ওপর স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিমান হামলাটি পরিচালনা করতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category