• রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন
Headline
ঈদুল আজহা এলেই সিজনাল সুশীলদের প্রাণিপ্রেমের অদ্ভুত মায়াকান্না শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ বিদেশ থেকে মহাখালীর হাসপাতাল পাড়া নিয়ন্ত্রণ করছে ‘রুবেল বাহিনী’ কতটুকু মাংস খাওয়া নিরাপদ? মাসিক ব্যবস্থাপনায় শৌচাগার সংকট ও সামাজিক সচেতনতার অভাব কলকাতায় কোরবানির ঈদ: রাজনৈতিক পালাবদলে চেনা উৎসবের নতুন রূপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে হুমকি: উদ্বিগ্ন নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীরা আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন? এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ চামড়ার বাজারে চরম ধস হতাশায় ভুগছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

ঈদুল আজহা এলেই সিজনাল সুশীলদের প্রাণিপ্রেমের অদ্ভুত মায়াকান্না

জাহিদ হাসান জুয়েল / ৫ Time View
Update : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

প্রতি বছর জিলহজ মাস বা পবিত্র ঈদুল আজহা এলেই আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত ও হাস্যকর দৃশ্যের অবতারণা হয়। হঠাৎ করেই একদল মানুষের মধ্যে প্রাণীদের প্রতি তীব্র ভালোবাসা এবং দয়া জেগে ওঠে। সারাবছর ধরে যারা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বসে প্লেটভর্তি দামি মাংস তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেন, তাদের মনে বছরের অন্য কোনো সময় কোনো করুণা জাগে না। কিন্তু কোরবানির সময় ঘনিয়ে এলেই তাদের চোখে যেন কান্নার ঢল নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সব জায়গায় শুরু হয় তথাকথিত এই সিজনাল সুশীল সমাজের প্রাণিপ্রেমের মায়াকান্না। আজ আমরা যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং পরিসংখ্যানের আলোকে এই সিজনাল সুশীলদের দ্বিমুখী আচরণের পেছনের আসল সত্য এবং তাদের ভণ্ডামির মুখোশটি পুরোপুরি উন্মোচন করার চেষ্টা করব।

পৃথিবীর খাদ্যচক্র এবং বৈশ্বিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে যদি আমরা একটি যৌক্তিক দৃষ্টিপাত করি, তবে কিছু বিস্ময়কর ও চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য আমাদের সামনে উঠে আসবে। আপনারা কি জানেন, প্রতিদিন সারা বিশ্বে মানুষের খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্য গড়ে প্রায় বাইশ কোটি প্রাণী জবাই করা হয়? হ্যাঁ, সংখ্যাটি বছরে নয়, প্রতিদিন বাইশ কোটি! সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাংসাশী বা আমিষভোজী। এর বিপরীতে বিশ্বে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৬ শতাংশের কাছাকাছি। অত্যন্ত সহজ গণিতের হিসেবে দেখা যায়, বাকি ৬৪ শতাংশ অমুসলিম মানুষ যখন প্রতিদিন অগণিত প্রাণী নিজেদের রসনার তৃপ্তি মেটানোর জন্য সাবাড় করছেন, তখন কিন্তু এই সুশীলদের কণ্ঠ থেকে কোনো প্রতিবাদের আওয়াজ শোনা যায় না। বছরে একবার পবিত্র ঈদুল আজহায় বিশ্বজুড়ে মাত্র সাত থেকে দশ কোটি প্রাণী কোরবানি করা হয়। একটু ভেবে দেখুন, যেখানে প্রতিদিন বাইশ কোটি প্রাণী মারা হচ্ছে, সেখানে বছরে মাত্র একবার দশ কোটি প্রাণীর কোরবানি নিয়ে এত হাহাকার কতটা যৌক্তিক? এটি স্পষ্টতই প্রাণীর প্রতি কোনো প্রকৃত ভালোবাসা নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের উৎসবের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।

পুঁজিবাদী বিশ্বের কর্পোরেট রেস্তোরাঁগুলোর দিকে তাকালে এই দ্বিচারিতা আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস, বার্গার কিং কিংবা বিশ্বের বড় বড় চেইন রেস্টুরেন্টগুলোতে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার টন মাংস অত্যন্ত যান্ত্রিক ও অমানবিক প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে পরিবেশন করা হয়, তখন কেউ টুঁ শব্দটিও করে না। তখন কেউ তাদেরকে নিষ্ঠুর বা অমানবিক বলে আখ্যায়িত করে না। কারণ সেখানে রয়েছে বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যের গন্ধ, কর্পোরেট পুঁজির দাপট এবং আধুনিকতার মোড়ক। কিন্তু সাধারণ মুসলমানরা যখন ধর্মীয় আবেগ ও ত্যাগের মহিমায় বছরে একবার কোরবানি দেন, তখন সেটা রাতারাতি ‘নিষ্ঠুরতা’ বা ‘বর্বরতা’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে যায়। কর্পোরেট কসাইখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি মুরগি বা গরুকে যখন মেশিনের নিচে ফেলে হত্যা করা হয়, সেটি হয়ে যায় তাদের ভাষায় ‘সাপ্লাই চেইন’ বা ‘বিজনেস’। আর কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেখানে কেবল একা মাংস খাওয়া নয়, বরং সমাজের গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে তা সমানভাবে বিলিয়ে দেওয়া, সেটিকে তারা চিহ্নিত করে নিষ্ঠুরতা হিসেবে। এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?

এই সিজনাল সুশীলদের সবচেয়ে বড় আস্ফালন এবং উসকানিমূলক মন্তব্যগুলো সাধারণত আসে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছ থেকে। সেখানে গোমাতার নামে যে পরিমাণ লম্ফঝম্ফ করা হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম সত্যটি জানলে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য হবেন। ভারত আজ বৈশ্বিক গরুর মাংস বা গোমাংস রপ্তানিতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। অবাক করার মতো তথ্য হলো, ভারতের শীর্ষ তিনটি মাংস রপ্তানিকারক কোম্পানির মালিক কিন্তু কোনো মুসলিম নন, তারা সবাই অমুসলিম। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে মাংস রপ্তানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামালে সেটি হয়ে যায় রাষ্ট্রের বৈধ ব্যবসা এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর হাতিয়ার। কিন্তু সাধারণ মুসলিমরা ধর্মীয় ইবাদত হিসেবে নিজের উপার্জিত অর্থে কোরবানি দিলে সেটি হয়ে যায় নির্মমতা। কী চমৎকার এবং নির্লজ্জ দ্বিচারিতা! যখন রপ্তানির জন্য প্রতিদিন লাখ লাখ গরু জবাই করা হয়, তখন সেই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রাণিপ্রেম কোথায় গিয়ে লুকিয়ে থাকে, সেটি এক বিরাট প্রশ্ন।

অনেকে আবার ইসলাম ধর্ম এবং মাংস খাওয়ার বিষয়টিকে একে অপরের অপরিহার্য পরিপূরক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। অথচ এটি একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। ইসলামে কোথাও এমন কথা বাধ্যবাধকতা হিসেবে বলা নেই যে, একজন ভালো মুসলিম হতে হলে তাকে মাংস খেতেই হবে। ইসলাম মানুষের খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা দিয়েছে। একজন মানুষ চাইলে সম্পূর্ণ নিরামিষাশী হয়েও ইসলামের সব রীতিনীতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করতে পারেন এবং একজন আদর্শ মুসলিম হতে পারেন। কোরবানির পশু জবাই করাটা কেবল গোশত খাওয়ার উৎসব নয়, এটি হলো হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের প্রতীকি অনুসরণ। নিজের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার এবং মোহকে কোরবানি দেওয়াই হলো এর মূল দর্শন।

তাহলে মূল সমস্যাটা আসলে কোথায়? সমস্যাটা প্রাণীদের প্রতি করুণা বা দয়া নয়। সমস্যাটা হলো ঘৃণার চশমা। যারা চোখে এই বিদ্বেষের চশমা পরে থাকেন, তারা প্রতিদিনের কোটি কোটি প্রাণীর প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা দেখতে পান না। তাদের চোখে কেবল ঈদের দিনের কোরবানিটাই অপরাধ হিসেবে বিদ্ধ হয়। তাই এই সিজনাল প্রাণিপ্রেমীদের প্রতি আমাদের স্পষ্ট আহ্বান—আপনাদের এই কুম্ভীরাশ্রু বা মায়াকান্না এবার বন্ধ করুন। সারা বছর যে ৯০ শতাংশ মানুষ মাংস খাচ্ছে এবং প্রতিদিন বাইশ কোটি প্রাণী হত্যা করছে, আগে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। ভারতের মাংস রপ্তানির বিশাল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আগে দাবি তুলুন। তারপর না হয় কোরবানির করুণা নিয়ে কথা বলতে আসবেন। অন্যের পবিত্র ইবাদতে অযাচিতভাবে নাক গলানোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভণ্ডামির রূপটা একবার ভালো করে দেখে নিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category