• মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন
Headline
২ বছর ধরে নিখোঁজ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ২৩ বাংলাদেশি সোনার বাজারে অস্থিরতা এখন সোনা কিনবেন নাকি বেচবেন বঙ্গোপসাগরের বিশাল গ্যাস সম্পদ উত্তোলনে আটকে আছে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ

২ বছর ধরে নিখোঁজ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ২৩ বাংলাদেশি

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

শরীয়তপুরের তুলাতলা গ্রামের একটি সরু রাস্তার পাশেই টিনের চালার একটি সাধারণ বাড়ি। এটি কৃষক ও খণ্ডকালীন গবাদিপশু ব্যবসায়ী সেলিম জমাদ্দারের বসতভিটা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে তিনি আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই খুব স্বাভাবিক একটি জীবনযাপন করছেন। বাড়ির ভেতরে তাঁর স্ত্রী রিনা বেগম সকালের গৃহস্থালি কাজ নিয়ে ব্যস্ত, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে থালাবাসন ধোয়ার চিরচেনা শব্দ। বাইরে থেকে সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হলেও, এই পরিবারের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বুকফাটা আর্তনাদ। যখনই তাঁদের একমাত্র ছেলে রাশেদুল ইসলামের কথা জানতে চাওয়া হয়, তখন এই নীরবতা ভেঙে নেমে আসে গভীর বিষাদ। রাশেদুল ২০২৩ সালে লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।

কাঁপা কাঁপা গলায় রিনা বেগম বলতে শুরু করেন সেই দালালদের কথা, যারা তাঁর ২৪ বছর বয়সী ছেলেকে ইউরোপের উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে এই বিপজ্জনক পথে পা বাড়াতে প্ররোচিত করেছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গোনেন তাঁরা, কিন্তু একসময় সেই ফোন কল আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই অসহায় মা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দুই বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ তিনি আজও জানেন না তাঁর ছেলে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। শুধু রিনা বেগমই নন, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত দুই ডজন পরিবারের চিত্র এখন ঠিক এমনই। তাঁদের প্রিয়জনেরা লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার এই ভয়ংকর পথে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে গেছেন।

ইতালির স্বপ্ন ও পাচারকারীদের পাতা ফাঁদ

প্রাপ্ত তথ্যমতে, শরীয়তপুরের ১৮ জন এবং মাদারীপুরের ৫ জনসহ মোট ২৩ জন তরুণ ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ইউরোপে লোভনীয় চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানব পাচারকারী চক্র তাঁদের লিবিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। এই পরিবারগুলো আজ পর্যন্ত জানে না তাঁদের সন্তানেরা লিবিয়ার কোনো বন্দিশিবিরে আটকে আছেন, নাকি দালালদের গোপন আস্তানায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অথবা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিলসমাধি ঘটেছে। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার অনেক পরিবারের কাছে ইতালিতে পাড়ি জমানো কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং এটি তাদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘ইতালি গ্রাম’ বলেও ডাকেন, কারণ সেখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য ইতালিতে বসবাস করেন। মানব পাচারকারীরা এই সামাজিক দুর্বলতা খুব ভালো করেই জানে। তারা মূলত মাঝারি আয়ের কৃষক পরিবার, মধ্যপ্রাচ্যফেরত প্রবাসী এবং বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলাতে মরিয়া তরুণদের নিজেদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

রাশেদুল ছিলেন পাচারকারীদের এমনই এক লক্ষ্যবস্তু। তাঁর বাবা সেলিম জানান, ছেলে ২০২১ সাল থেকে সৌদি আরবের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করছিলেন, কিন্তু ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন তাঁর সবসময়ই ছিল। বাবা হিসেবে সেলিম ছেলেকে ইতালি পাঠাতে চাননি, কারণ তিনি এই পথের বিপদের কথা জানতেন। কিন্তু ২০২৩ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর রাশেদ খান ও টুন্নু খান নামের স্থানীয় দুই দালাল তাঁকে ফাঁদে ফেলে। ছেলেকে ইউরোপে পাঠাতে সেলিম জমাদ্দারকে শেষ পর্যন্ত দালালদের প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা দিতে হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তাঁকে গবাদিপশু বিক্রি করতে হয়েছে, জমি বন্ধক রাখতে হয়েছে, আত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে এবং এমনকি ২০ শতক জমির মালিকানাও পাচারকারীদের নামে লিখে দিতে হয়েছে।

লিবিয়ার বন্দিশিবির ও শেষ ফোনালাপ

পাচারকারীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশেদুলকে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সেখান থেকে মিসর এবং সবশেষে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। লিবিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজি থেকে তাঁকে উত্তর-পশ্চিমের ত্রিপোলিতে একটি ‘গেম ঘর’-এ নিয়ে রাখা হয়েছিল। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার আগে অভিবাসীদের এই গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ রাশেদুলের শেষ ফোন কলটি আসে। সেদিন সে বাবাকে শুধু বলেছিল, দালালরা তাদের ফোন কেড়ে নিচ্ছে, এরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর দালালরা নানা টালবাহানা শুরু করে। প্রথমে তারা জানায় রাশেদুল মাল্টায় আটক আছে, পরে বলে সে ইতালিতে পৌঁছে গেছে। একপর্যায়ে দালালরা নিজেদের মোবাইল বন্ধ করে পুরোপুরি আত্মগোপনে চলে যায়।

কাছাকাছি চর চটাং গ্রামের আরেক গৃহবধূ কমলা বেগমও তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছেলে আমিনুল ইসলামের কোনো খবর না পেয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে পথ চেয়ে বসে আছেন। আমিনুল ২০২০ সালে দুবাই গিয়েছিলেন, কিন্তু দালালরা তাঁকে বোঝায় যে ইতালিতে গেলে তিনি আরও অনেক বেশি টাকা আয় করতে পারবেন। ২০২৩ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং একই পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে লিবিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। ত্রিপোলির ‘গেম ঘর’-এ পৌঁছানোর আগে এই পরিবার পাচারকারীদের ধাপে ধাপে প্রায় ১৮ লাখ টাকা দিয়েছিল। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আমিনুলের শেষ ফোনটি আসে। কয়েক সেকেন্ডের সেই কলে সে শুধু জানিয়েছিল যে সে ত্রিপোলিতে পৌঁছেছে এবং পরে কথা বলবে। এরপর থেকে আর কোনো খবর নেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কমলা বেগম বলেন, তাঁর কোনো টাকার প্রয়োজন নেই, তিনি শুধু তাঁর ছেলেকে বুকে ফিরে পেতে চান।

নির্যাতনের বিভীষিকা ও পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

এই করুণ গল্পগুলো লিবিয়ার ভয়ংকর মানব পাচার ব্যবস্থার এক একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়ায় যে অরাজকতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা সেখানে এক রামরাজত্ব কায়েম করেছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা লিবিয়ায় অভিবাসীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক শ্রম এবং নির্বিচারে আটকে রাখার অসংখ্য প্রমাণ নথিভুক্ত করেছে। পাচারকারীরা প্রায়ই অভিবাসীদের ক্যাম্পে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালায় এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। তারা বৈদ্যুতিক শক দেয়, অনাহারে রাখে এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আরও অর্থের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টাকারী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা এখন অন্যতম শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া উপকূল থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিসহ ৩১ হাজারের বেশি অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের অনেকের মৃতদেহ কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আইওএম এবং লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস জেল বা বন্দিশিবির থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অভিবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। তবে ঠিক কতজন বাংলাদেশি বর্তমানে লিবিয়ার বন্দিশিবিরগুলোতে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অন্তহীন অপেক্ষা

নিখোঁজ এই তরুণদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিষয়টি হলো এই ভয়ংকর অনিশ্চয়তা। মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় তারা প্রিয়জনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে শোক পালন করতে পারে না; আবার বেঁচে থাকার কোনো প্রমাণ না থাকায় বুক বেঁধে আশাও দেখতে পারে না। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে দালালদের হুমকি। বেশ কয়েকটি পরিবার জানিয়েছে, স্থানীয় দালাল ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থেকে তাদের প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। শরীয়তপুর ও মাদারীপুর আদালতে এসব পাচারকারীর বিরুদ্ধে ডজনের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও পরে তারা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। উল্টো কিছু পাচারকারী ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা দায়ের করেছে। নিখোঁজ আতিকুর রহমানের বোন আফরোজা আক্তার জানান, পাচারকারীরা প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করে আত্মগোপনে চলে যায়। কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে সংবাদ সম্মেলন করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানানোর পর থেকে তারা প্রকাশ্যেই হুমকি দিতে শুরু করেছে।

প্রিয়জনদের আবার দেখার একটি ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে এই পরিবারগুলো বুকভরা শোক আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে। বাবারা তাঁদের বন্ধক রাখা জমিতে ফিরে গেছেন, যে জমি বন্ধক রেখে তাঁরা ছেলেদের ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন। মায়েরা আজও পথ চেয়ে থাকেন সেই ফোন কলের অপেক্ষায়, যে কল আর কখনোই আসে না। আর শিশুরা বড় হচ্ছে এই অনিশ্চয়তা নিয়ে যে, দূর দেশের অচেনা কোনো প্রান্তে তাদের বাবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।

তথ্যসূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category