একে একে ধরা পড়ছেন ২০০৭ সালের এক-এগারো (১/১১)-এর বহু আলোচিত ও প্রভাবশালী কুশীলবরা। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পরপরই গ্রেফতার হন ওই সময়ের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ। এই গ্রেফতারের ঘটনায় রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এক-এগারোর প্রসঙ্গ এলেই সবার আগে যার নাম উঠে আসে, তিনি হলেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় সবার আগে তাঁকেই সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই তথ্য তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন। কিন্তু সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অনমনীয় অবস্থান এবং মেয়াদের শর্তের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এ কারণেই বর্তমানে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—যেহেতু এক-এগারোর চক্রভেদ হতে শুরু করেছে, তাহলে কি ড. ইউনূসও আইনের আওতায় আসবেন?
১/১১-এর ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ও এর প্রভাব
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল, সেটি যে একটি সুপরিকল্পিত বা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-এর অংশ ছিল, তা নিয়ে এখন আর কেউ খুব একটা আলোচনা করেন না। এই ফখরুদ্দীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছিল। সেই বিজয়কে কাজে লাগিয়েই তারা পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র কায়েম করে এবং দীর্ঘ পনেরো বছর একটানা ক্ষমতায় টিকে থাকে।
যেহেতু এই নকশার কারণে আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েছিল, তাই ক্ষমতায় থাকাকালে তারা এই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-কে খুব একটা আমলে নেয়নি; বরং এর সঙ্গে জড়িত অনেককে নানাভাবে পুরস্কৃত করেছে। তবে ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, এর ধারাবাহিকতাতেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত হতে হয়।
২০০৭ সালের ওই ‘মেটিকুলাস ডিজাইনে’ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের নাম ছিল বিএনপি। এ কারণেই বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেই কুশীলবদের আইনের আওতায় আনতে শুরু করেছে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—যে পক্ষটি ২০০৭ সালে ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের অনেকেই আবার ২০২৪-এর নকশায়ও যুক্ত ছিলেন। কাজেই ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার’ আশঙ্কাও প্রবল।
বিরাজনীতিকরণ ও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা
চলুন, ধাপে ধাপে পেছনের ইতিহাস খুলে দেখি। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে জরুরি অবস্থা চলছে, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। রাজনৈতিক নেতারা গ্রেফতার এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঠিক এমন একটি সময়ে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে, ড. ইউনূস দেশবাসীর কাছে খোলা চিঠির মাধ্যমে জানতে চাইলেন—তিনি কীভাবে রাজনীতিতে আসবেন? এরপর তিনি ‘নাগরিক শক্তি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন, যার স্লোগান ছিল ‘বাংলাদেশ এগিয়ে চলো’।
এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘বিরাজনীতিকরণ’—অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিবিদদের বিতাড়ন করা। তিনি বলেছিলেন, “দুর্নীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি চাই।” কিন্তু সমালোচকরা বলেন, এটি আসলে ছিল ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’-এর অংশ, যার লক্ষ্য ছিল খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া।
রাজনৈতিক কার্যক্রম যখন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তখন সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে অনেক সূত্র নিশ্চিত করে। তাঁকে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মেয়াদ মাত্র দুই বছর হওয়ায় তিনি রাজি হননি। তার বদলে তিনি নিজেই দল গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ২০০৭ সালের মে মাসেই তিনি দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন, কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন—যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি।
গণমাধ্যমের ভূমিকা ও চরিত্র হনন
এবার আসা যাক সে সময়ের গণমাধ্যমের ভূমিকায়। ড. ইউনূসের এই বিরাজনীতিকরণের গল্প প্রচারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার। সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম সরাসরি ড. ইউনূসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা সেই সুশীল সমাজের অংশ, যারা ২০০৬ সাল থেকেই ‘সৎ প্রার্থীর’ দাবিতে আন্দোলন করছিলেন।
এক-এগারোর সময়ে এই দুই পত্রিকা এবং তাদের সঙ্গে চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজসহ আরও কয়েকজন মিলে তারেক রহমান, বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার দুর্নীতির গল্প সাজিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জনমত তৈরি করেছিলেন। সমালোচকরা বলেন, এটি ছিল পর্দার আড়ালের পরিকল্পনারই একটি অংশ—রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণ করে আসলে নিজেরাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পরবর্তীতে এই একই মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও ড. ইউনূসের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অনেকের মতেই, এক-এগারো আর ২০২৪-এর ঘটনা—দুটিই আসলে একই চক্রের খেলা; একবার ‘দুর্নীতি দমনের’ নামে, আরেকবার ‘সংস্কারের’ নামে।
গ্রেফতার অভিযান ও সোশ্যাল মিডিয়ার তালিকা
বর্তমানে জেনারেল মাসুদ ও মামুন খালেদের গ্রেফতার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি এক-এগারোর সব কুশীলবের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা?
গত ২৩ মার্চ রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে জেনারেল মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছে। ২৫ মার্চ আদালত আগামী ৯ এপ্রিল এই মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেছেন। অন্যদিকে, বুধবার গ্রেফতার হন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ।
এ পর্যন্ত দুজন হেভিওয়েট ধরা পড়লেও তালিকা এখানেই শেষ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪০-৪৫ জনের একটি তালিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাতে ড. ইউনূস থেকে শুরু করে ফখরুদ্দীন আহমদ, মঈন ইউ আহমেদ, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান, শাইখ সিরাজসহ অনেকের নাম রয়েছে। যদিও এই তালিকার কোনো নির্দিষ্ট তথ্যসূত্র নেই, কিন্তু গত কয়েক বছরে দেখা গেছে—সামাজিক মাধ্যমে চরিত্র হনন করেই মূলত গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়।
বিদেশে পলাতক কুশীলবরা
দুর্নীতি দমনের নামে গঠিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’-এর প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি একাদশ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। ২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংসদ বিলুপ্ত হলে তিনি কানাডায় পালিয়ে যান বলে জানা যায়। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে লিখছেন, আমেরিকা থেকে ভিসা বাতিল হওয়ায় দেশে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি গ্রেফতার হন।
তাঁর গ্রেফতারে ১/১১-এর অন্য কুশীলব, যারা বিদেশে আছেন, তাদের দেশে ফেরা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। সেই সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ মেয়াদ শেষে তড়িঘড়ি করে সামরিক অ্যাটাশে হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আরেক আলোচিত কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী গণতান্ত্রিক সরকারের আমল থেকেই স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে বসবাস করছেন। আরেক বিতর্কিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ টি এম আমিন বর্তমানে দুবাইয়ে আছেন বলে জানা যায়।
তবে সে সময়ের আরেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেশে রয়েছেন—তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, যিনি এক-এগারো সরকারের সময় দুদকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ ও একের পর এক মামলা করে তিনি ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন। তবে সামাজিক মাধ্যমের একটি অংশ হাসান মশহুদকে গ্রেফতার না করার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে; কেউ কেউ আবার তাঁর সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলছেন।
বিএনপি ও বর্তমান সমীকরণ
কেউ কেউ বলছেন, ২০০৭ সালের ১/১১ হোক কিংবা ২০২৪-এর ৫ আগস্ট—দুটি ঘটনার পরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ছিল বিএনপি। ২০২৪-এর আগস্টে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে তাঁর একধরনের টানাপোড়েন ছিল। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে বিএনপির ঘাড়ে এমন কিছু বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে বিএনপি তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছিল। তৃতীয়ত, ইউনূস সরকারের বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের বসানো হয়েছিল, যাদের সঙ্গে বিএনপির আদর্শিক বিরোধ স্পষ্ট।
যদিও ২০০৭ সালের এক-এগারো এবং ২০২৪ সালের আগস্টের পটভূমি ও প্রতিপক্ষ এক নয়, কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই যারা সুবিধাভোগী অবস্থানে ছিলেন—তারা প্রায় একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এ জন্যই এই দুই ঘটনার মধ্যে অনেকে সাযুজ্য খুঁজে পান।
এক-এগারোর শেকড়ে হাত পড়লেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিচার প্রক্রিয়া ঠিক কত দূর এগোবে? শুধু কয়েকজন জেনারেল আর আমলাকে শাস্তি দিয়েই কি এই প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হবে, নাকি এক-এগারোর মূল স্থপতি ও মাস্টারমাইন্ডদেরও খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে? দেশবাসী এখন সেদিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।