• বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

কৃষকের হাহাকার, মজুত পর্যাপ্ত: সারের বাজারে নেপথ্যের খেলা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সারাদেশে সরকারি গুদামগুলোতে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত থাকার কথা বলা হচ্ছে। সরকার বলছে নতুন বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত, আর বিদেশ থেকে লাখ লাখ টন সার আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চরম হতাশাজনক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ন্যায্য মূল্যে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। সার সংগ্রহের জন্য কোথাও কোথাও কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে মাত্র এক বস্তা সার। আবার কোথাও সরকারি ডিলারের দোকানে গিয়ে ‘সার নেই’ শোনার পর সেই একই সার বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এই কৃত্রিম সংকটের ভয়াবহতা এতটাই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা এক ডিলারের গুদামের তালা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান, যদিও পরে তারা কিছু সার ফেরত দিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের হতাশা ও ক্ষোভ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, দেশে যদি সত্যিই সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকে, তবে কৃষকের হাতে সেই সার ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না কেন? কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত ৩১ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে চার ধরনের সারের মোট মজুত রয়েছে ১২ লাখ ৮৬১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার মজুত ৪ লাখ ১৩৭ টন, টিএসপির মজুত ৩ লাখ ৬৫৯ টন, ডিএপির মজুত ৩ লাখ ৬৮৫ টন এবং এমওপি সারের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টন। এত বিপুল মজুত থাকার পরও রাজশাহী, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ ও ঝিনাইদহসহ দেশের অন্তত ১০টি জেলার কৃষকদের কাছ থেকে সার না পাওয়া বা চড়া দামে সার কেনার অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের জন্য দেশে মোট সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারের প্রকৃত সংকট জাতীয় মজুতের সামগ্রিক হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ কোনো নির্দিষ্ট জেলায় হয়তো ইউরিয়া উদ্বৃত্ত থাকতে পারে, কিন্তু একই সময়ে অন্য কোনো জেলায় টিএসপি সারের চরম ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আবার সরকারি গুদামে সার পড়ে থাকলেও ডিলাররা যদি সময়মতো সেই সার উত্তোলন না করেন, তবে কৃষকের কাছে সেই মজুতের কার্যত কোনো সুফল পৌঁছায় না।
সরকারও মাঠপর্যায়ের এই বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার কথা অস্বীকার করছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর তার নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় সারের যে সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তা মূলত বিতরণ পর্যায়ের ত্রুটির কারণে হয়েছে, এটি কোনোভাবেই সামগ্রিক সারের ঘাটতি নয়। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘‘সারের কোনও সংকট নেই। বিতরণ পর্যায়ে দুই-একটি জায়গায় সমস্যা হয়েছিল। আমরা আশা করছি, সেটাও ঠিক হয়ে যাবে।’’ এর আগে গত ২৯ আগস্ট ফরিদপুরে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, বরং একটি অসাধু মহল পরিকল্পিতভাবে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার জন্য দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি জানান, যেসব খুচরা বিক্রেতা বেশি টাকার বিনিময়ে সার সরবরাহ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারের এই ভাষ্য থেকেই এটি সুস্পষ্ট যে, বর্তমান সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু মূলত সারের মজুত নয়, বরং বিতরণ ব্যবস্থা, দুর্বল তদারকি এবং স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা।
মাঠপর্যায়ের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যেই সেপ্টেম্বরের বরাদ্দকৃত সার আগস্ট মাসেই আগাম উত্তোলনের সুযোগ করে দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা শাখার এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আগস্টের বরাদ্দকৃত সার অধিকাংশ জেলায় উত্তোলন হয়ে যাওয়ায়, ডিলাররা চাইলে সেপ্টেম্বরের বরাদ্দকৃত সার ২৫ আগস্ট থেকেই উত্তোলন করতে পারবেন। শুধু সেপ্টেম্বর মাসের জন্যই নতুন করে ২ লাখ ২৬ হাজার টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ডিলার নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দের সার গুদাম থেকে তুলছেন না। এছাড়া অনুমোদিত এলাকার বাইরে গোপনে সার সরিয়ে নেওয়া, খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের দায়ে ইতিমধ্যেই অন্তত পাঁচটি ডিলারশিপ লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রায় ২৫ জন ডিলারকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
রাজশাহীর চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে এই বরাদ্দের অসামঞ্জস্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) রাজশাহী জেলা ইউনিটের সভাপতি মো. ওছমান আলীর মতে, রাজশাহীর সরকারি গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও কৃষকের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ অনেক কম হওয়ায় ডিলার পর্যায়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিএফএ-এর কোষাধ্যক্ষ আব্দুল গণি মনে করেন, আগামী আলু ও পেঁয়াজ মৌসুমকে সামনে রেখে সার না পাওয়ার আতঙ্কে অনেক কৃষক প্রয়োজনের অনেক আগেই অতিরিক্ত সার কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ ফেলছে। আবার দেশের সব অঞ্চলে সারের চিত্র এক নয়। সাতক্ষীরার বড় বাজারের কৃষি ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী আব্দুল আজিজ জানিয়েছেন, তার এলাকায় বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই এবং কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন। তার মতে, জলাবদ্ধতার কারণে ওই এলাকায় ধানের আবাদ কমে যাওয়ায় এবং অধিকাংশ জমি ঘের বা মৎস্য চাষের আওতায় চলে আসায় সারের ব্যবহার তুলনামূলক অনেক সীমিত হয়ে পড়েছে। এক অঞ্চলে দীর্ঘ লাইন আর অন্য অঞ্চলে স্বাভাবিক সরবরাহ—এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, জাতীয় মজুতের চেয়ে অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থাতেই মূল গলদ লুকিয়ে আছে।
এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো দেশীয় সার উৎপাদনে চরম ব্যর্থতা। দেশে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে সাতটি বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা রয়েছে। এর বাইরে যৌথ মালিকানাধীন কাফকো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরিয়া উৎপাদক। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার মধ্যে মাত্র তিনটি কারখানা (ঘোড়াশাল-পলাশ, শাহজালাল ও যমুনা) এবং কাফকো উৎপাদনে ছিল। বাকি চারটি বড় কারখানা (সিইউএফএল, আশুগঞ্জ, ডিএপি ও টিএসপি) উৎপাদনের বাইরে পড়ে ছিল। এই সাতটি কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে দেশে মোট সারের চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। বিসিআইসির গ্যাসভিত্তিক কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও স্বাভাবিক সময়ে এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা গেলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন সার দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হতো। গ্যাস সংকটে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু চার ধরনের সারের সরকারি চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৮ লাখ ৫ হাজার টন। শুধুমাত্র আগস্ট মাসেই প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার টন সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category