হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে যারা ব্যাংকগুলোকে রুগ্ণ করেছে, সেই শীর্ষ ঋণখেলাপিদের হাতেই কি আবারও ফিরছে ব্যাংকের মালিকানা? সম্প্রতি দেশের আর্থিক খাতে এমন একটি প্রশ্ন ও গুঞ্জন জোরালো হয়ে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে, একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আবারও এস আলম এবং নাসা গ্রুপের মতো বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে শুরু হওয়া ব্যাংক একীভূতকরণের প্রক্রিয়াটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসে চূড়ান্ত রূপ পায়। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি রুগ্ণ ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে নতুন ব্যাংক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ (যার সম্ভাব্য নাম ছিল ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক)।
গুঞ্জন রয়েছে, নবগঠিত এই ব্যাংকটির ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ জমা দিয়েই পুরোনো মালিকরা (এস আলম ও নাসা গ্রুপ) আবারও ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছেন। যারা ব্যাংকগুলোকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে, তাদের হাতেই ফের মালিকানা যাওয়ার এই খবরে জনমনে চরম ক্ষোভ ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
আসল সত্য ও বর্তমান পরিস্থিতি কী বলছে?
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খেলাপিদের কাছে ব্যাংক ফেরত যাওয়ার এই খবরটি মূলত একটি ভিত্তিহীন গুঞ্জন। বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন:
পুরোনো শেয়ার শূন্য ঘোষণা: বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫’-এর আওতায় এই পাঁচটি ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের (যাদের মধ্যে এস আলম গ্রুপ অন্যতম) শেয়ার সম্পূর্ণ বাতিল বা ‘শূন্য’ ঘোষণা করেছে। ব্যাংকগুলোর নিট সম্পদমূল্য বিপুল পরিমাণে ঋণাত্মক হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ মূলত বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। এর মালিকানা এখন আর কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা গ্রুপের হাতে থাকছে না।
নতুন পরিচালনা পর্ষদ: ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এরই মধ্যে ৭ সদস্যের একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিয়েছে। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে রাজধানীর সেনা কল্যাণ ভবনে।
অর্থ লোপাটের ভয়াবহ চিত্র: উল্লেখ্য, বিগত সরকারের আমলে এই ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম গ্রুপ একাই নামে-বেনামে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি বের করে নিয়েছে। এই বিপুল অর্থ পাচার ও হরিলুটের কারণেই ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়।
আমানতকারীদের টাকা ফেরত: বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এই ব্যাংকটির মাধ্যমে গ্রাহকদের আটকে থাকা আমানত ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে।
যেসব ঋণখেলাপি ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের হাতে নামমাত্র মূলধনে আবারও ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়ার বিষয়টি বর্তমান সরকারের আর্থিক সংস্কার নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং, এস আলম বা নাসা গ্রুপের কাছে ব্যাংক ফেরত যাওয়ার যে তথ্যটি ছড়াচ্ছে, তা বর্তমান বাস্তবতার সাথে মেলে না। বরং সরকার ব্যাংকগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঢেলে সাজানোর কাজ করছে।