দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের একসময়ের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্ব ও মতবিরোধ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন এবং এর সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণভোটের রায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা না হলে দেশ সত্যিকার অর্থে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হবে না।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। তাঁর এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন এবং এর সাথে একই দিনে হওয়া গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে ক্ষমতাসীন বিএনপির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করেছে, কিন্তু জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের রায়কে উপেক্ষা করছে।
জামায়াত আমির বলেন, “সম্প্রতি দেশে দুইটি ভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি ভোটের (জাতীয় সংসদ নির্বাচন) রায় বিএনপির পক্ষে যাওয়ায় তারা সেটি সানন্দে মেনে নিয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে। কিন্তু অপরদিকে, রাষ্ট্রের সংস্কার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নিজেদের রায় জানালেও, বিএনপি তা মানতে চাইছে না।”
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “ওই ৭০ শতাংশ মানুষের ম্যান্ডেট বা রায় যেদিন থেকে রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত হবে, বাংলাদেশ থেকে সত্যিকার অর্থে সেদিনই স্বৈরাতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের চিরতরে বিদায় ঘটবে। এর আগে কোনোভাবেই দেশ স্বৈরাচারমুক্ত বলা যাবে না।”
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নিজে যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে থাকেন, তবে তা নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে তাঁর অবস্থানকে নির্দেশ করে। কিন্তু সরকার গঠনের পর এখন সেই সংস্কার বাস্তবায়নে যে অনীহা বা কালক্ষেপণ দেখা যাচ্ছে, তা সরাসরি দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।”
জামায়াতের শীর্ষ এই নেতা মনে করেন, ৫ আগস্টের পর দেশের মানুষ যে কাঠামোগত পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, গণভোটের রায় উপেক্ষা করার মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে গলাটিপে হত্যা করার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান সরকারের শাসনামলে নতুন করে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির দাবি করেন যে, বিএনপি ক্রমশ ফ্যাসিবাদের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি নেত্রকোণায় ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হামলার ঘটনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “নেত্রকোণায় সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফা এবং ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নেতাদের ওপর যে ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট করে দেয় যে বিএনপি এখন ফ্যাসিবাদের দিকেই হাঁটছে। বিরোধী মতকে দমন করা এবং শক্তির মহড়া দেখানোর এই প্রবণতা পুরোনো স্বৈরাচারেরই প্রতিচ্ছবি।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান গত জুলাই ও আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার এই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হলেও, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই পরিবর্তন এসেছে, সেই জুলাইয়ের শহীদদের সরকার ভুলে যেতে বসেছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেসব ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে, সেই জুলাই শহীদদের স্মরণ বা তাদের পরিবারকে সম্মান জানানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। এটি শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা।”
বিশ্লেষণ: সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা রোধ এবং জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে সামনে এনে তারা জনমত গঠনের চেষ্টা করছে। সরকার যদি এসব বিষয়ে দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে রাজপথের রাজনীতি অচিরেই আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।