• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৪:৩২ অপরাহ্ন

গরিবের বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বিইআরসির তড়িঘড়ি প্রত্যাহার

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

গ্রাহকদের আবেদন ও প্রস্তাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সেই বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের নতুন আদেশ জারি করতে বাধ্য হয়েছে কমিশন। মূলত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দেওয়া সম্পূরক প্রস্তাব যাচাই-বাছাই না করেই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলেই এই নজিরবিহীন ভুলের সৃষ্টি হয়। পরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও তীব্র সমালোচনার মুখে নিজেদের ভুল আড়াল করতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।

দাম বৃদ্ধি ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুর বদল

গত ৩ জুন বিইআরসি আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে। সেই আদেশে লাইফলাইন বা প্রান্তিক গ্রাহকদের (০ থেকে ৫০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়। একই সঙ্গে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কিন্তু দরিদ্র মানুষের ওপর এই বাড়তি খরচের বোঝা চাপানোর পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের ভুল আড়াল করতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলেই এক জরুরি আদেশে এই বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় বিইআরসি। এর ফলে লাইফলাইন ও দ্বিতীয় ধাপের গ্রাহকদের জন্য আগের দামই বহাল থাকছে। তবে এই দাম প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রাক্কলিত রাজস্ব আয় প্রায় ৭৮১ কোটি টাকা কমে যাবে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ও লাইফলাইনের গুরুত্ব

দেশে বিদ্যুৎ বিতরণের ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য মোট ছয়টি স্তর বা স্ল্যাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি স্তর (০-৫০ এবং ০-৭৫ ইউনিট) তৈরিই করা হয়েছে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। বর্তমানে সারা দেশে এই শ্রেণির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার, যার মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ thousand ৫৯১টি সংযোগই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত।

গ্রামীণ অঞ্চলের বর্গাচাষি, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে কেরোসিনের চেয়েও কম খরচে আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই ‘লাইফলাইন’ সুবিধা চালু করা হয়েছিল। রাতে আলোর সুব্যবস্থা থাকলে গ্রামীণ শিশুরা পড়াশোনার জন্য বাড়তি সময় পায়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। এই মানবিক দিকটি বিবেচনা করেই অতীতেও যেকোনো মূল্যবৃদ্ধির সময় এই স্তর দুটিকে ছাড় দেওয়া হতো।

পিডিবির সম্পূরক প্রস্তাব ও বিইআরসির চরম অবহেলা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিইআরসির এই ভুলের পেছনে ছিল তাদের চরম প্রশাসনিক গাফিলতি ও উদাসীনতা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গত ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানির দিনই একটি সম্পূরক প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, দেশের দরিদ্রতম মানুষের কথা চিন্তা করে প্রথম দুটি স্ল্যাবের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিইআরসি সেই গুরুত্বপূর্ণ সম্পূরক আবেদনটি আমলেই নেয়নি।

এ বিষয়ে পিডিবির সদস্য (বিতরণ) মো. আব্দুল বাছিদ জানান, তারা গণশুনানির দিনই এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু কমিশন তা বিবেচনা না করেই গত বুধবার দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে বৃহস্পতিবার তারা আবারও একই আবেদন নিয়ে কমিшению যেতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ স্বীকার করেছেন যে গরিব মানুষের দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে কেন তা তখন বাস্তবায়ন করা হয়নি, তার জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, চূড়ান্ত আদেশের সময় বিষয়টি তাদের খেয়ালই ছিল না।

পাঁচ দিনের তড়িঘড়ি ও প্রাতিষ্ঠানিক আতঙ্ক

আইন অনুযায়ী গণশুনানি শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন মূল্যহার ঘোষণার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এবার বিইআরসি মাত্র ১৩ দিনের মাথায় আদেশ জারি করে। এই ১৩ দিনের মধ্যে আবার সাত দিনই ছিল ঈদের ছুটি। ফলে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে কয়েক লাখ কোটি টাকার জটিল আর্থিক হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এত অল্প সময়ে এই ধরনের সংবেদনশীল প্রস্তাব যাচাই করা অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর পেছনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আতঙ্কও কাজ করছে বলে জানা গেছে। বিগত সরকারের আমলে বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব করে executive বা আদেশে দাম বাড়ানোর আইন করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বাতিল করে পুনরায় কমিশনের হাতে ক্ষমতা ফেরত দেওয়া হয়। ফলে বিইআরসি কর্মকর্তাদের মনে এক ধরনের ভয় কাজ করছে যে, কোনো কারণে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে সরকার আবার তাদের ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে। এই ভুলের বা ভয়ের কারণেই তারা যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে সরকারি চাওয়াকে অন্ধভাবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই ঐতিহাসিক ভুলটি করে বসেছেন।

তবে পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বিষয়টিকে একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন:

“কমিশন হয়তো কোনো কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিল। কাজ করতে গেলে মানুষের ভুল হতেই পারে, তবে তারা এটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সংশোধন করেছে।”

প্রকৃতির এই চরম বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য দ্রুত এই সংশোধনী দেওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category