দূরপাল্লার যাত্রায় যাত্রীদের কাছে আরামদায়ক ভ্রমণের প্রধান বাহন হিসেবে স্লিপার বাসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর ও লোমহর্ষক বাস্তবতা। একতলা বিশিষ্ট সাধারণ বাসের চেসিস বা কাঠামো জোড়াতালি দিয়ে অবৈধভাবে রূপান্তর করে তৈরি করা হচ্ছে দুই তলা বিশিষ্ট এসব স্লিপার কোচ। ঢাকা-কক্সবাজার, সিলেট কিংবা সুনামগঞ্জের মতো ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোতে প্রতিদিন যে শত শত বিলাসবহুল স্লিপার বাস যাত্রী নিয়ে ছুটছে, তার বড় একটি অংশেরই ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন কিংবা বৈধ রুট পারমিটের কোনো বালাই নেই। কাগজপত্রে যে গাড়িগুলোর আয়ু অনেক আগেই ফুরিয়ে যাওয়ার কথা কিংবা যেগুলো সাধারণ সিঙ্গেল ডেকার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল, সেগুলোকেই কারখানায় কেটেকুটে ডাবল ডেকার স্লিপার বানিয়ে মহাসড়কে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরামের এই বাহনগুলো শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য একেকটি চলমান মৃত্যুফাঁদ বা কফিনে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই পুরো অবৈধ কারবারের পেছনে কাজ করছে আমদানিকারক, পরিবহন মালিক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নিয়ম অনুযায়ী মোটরযানের কাঠামোগত পরিবর্তন বা মডিফিকেশন করে শ্রেণির পরিবর্তন ঘটাতে হলে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন ও উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ঢাকার আমিনবাজারের মতো বিভিন্ন এলাকার গোপন কারখানায় কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড না মেনে রাতের পর রাত নামসর্বস্ব বাসের বডি পরিবর্তন করা হচ্ছে। যেখানে একটি সম্পূর্ণ আমদানি করা মানসম্মত স্লিপার বাস কিনতে তিন থেকে চার কোটি টাকা খরচ হয়, সেখানে দেশীয় কারখানায় মাত্র এক থেকে দেড় কোটি টাকার বিনিময়ে পুরোনো চেসিসের ওপর বিপজ্জনকভাবে এই দোতলা বাসগুলো তৈরি করা হচ্ছে। কম খরচে বেশি মুনাফা লোটার মানসে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিআরটিএর নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এই অনিয়মের এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। আইকনিক এক্সপ্রেস, বেঙ্গল পরিবহন কিংবা গোল্ডেন লাইনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী কোম্পানির বহরে এমন অনেক বাস চলাচল করছে যেগুলোর রেজিস্ট্রেশন নম্বর কিংবা ফিটনেসের কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। অনেক ক্ষেত্রে একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক আলাদা গাড়ি ভিন্ন ভিন্ন রুটে অবাধে চালিয়ে যাওয়ার মতো জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে যখন এসব পরিবহন মালিকদের মুখোমুখি করা হয়, তখন প্রথমে তারা বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। তবে চোখের সামনে সুনির্দিষ্ট প্রামাণিক ফুটেজ ও দলিলপত্র তুলে ধরার পর তাদের সেই দম্ভ মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় এবং তারা স্বীকার করতে বাধ্য হন যে প্রচলিত সিস্টেম বা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এই গাড়িগুলো বছরের পর বছর ধরে সড়কে বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।
সড়ক পরিবহন খাতের এই অনিয়মের বিস্তার কতটা গভীরে প্রোথিত, তার প্রমাণ মেলে বাস মালিক সমিতির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বক্তব্যেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ বা কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ একটি গাড়িও কখনো ফিটনেস সার্টিফিকেট পেতে পারে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র ও দালালের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঘুষের বিনিময়ে পরিদর্শকরা গাড়ি না দেখে কিংবা সিঙ্গেল ডেকার বাসকে ডাবল ডেকার হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার নথিতে স্বাক্ষর করে দিচ্ছেন। হাইওয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মাসোহারা বা উৎকোচ দিয়ে এই অবৈধ যানগুলো মহাসড়কে সচল রাখা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বা টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, সড়ক পরিবহন খাতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ বছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ পকেটে যায় সংশ্লিষ্ট অসাধু নিয়ন্ত্রক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেন্টুলামের মতো দোল খাওয়া এসব ভারী ও ভারসাম্যহীন স্লিপার বাস যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। অতীতে মহাসড়কে ঘটা একাধিক মর্মান্তিক সংঘর্ষে ছোট শিশুসহ বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় এই অবৈধ বাসগুলোর কাঠামোগত ত্রুটি ও বেপরোয়া চালনার বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। সচেতন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে এই অবৈধ যানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে চক্রটি। বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এভাবেই আইনের ফাঁকফোকর ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে সাধারণ যাত্রীদের জীবন জিম্মি হয়ে পড়েছে এক লোভী সিন্কেডের কাছে। অবিলম্বে এই কাঠামোগত ত্রুটিযুক্ত স্লিপার বাসগুলোর চলাচল কঠোর হাতে বন্ধ করা না হলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘতর হবে।