• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন

চীন-ভারতের হাতে কি বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ!

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা পশ্চিমা আধিপত্যের অবসান ঘটার সময় সম্ভবত ঘনিয়ে আসছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র খুব দ্রুত গতিতে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে বাংলাদেশের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র—চীন এবং ভারত। লন্ডনভিত্তিক প্রখ্যাত গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) সম্প্রতি তাদের বিশ্ব অর্থনৈতিক তালিকায় ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমগ্র বিশ্বের মোট অর্থনীতির আকার ছিল আনুমানিক ১১৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে এই আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২২৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র পনেরো বছরের ব্যবধানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে যুক্ত হবে প্রায় ১১০ ট্রিলিয়ন ডলার। কাঠামোগত হিসাব কষলে দেখা যায়, এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে বিশ্ব অর্থনীতিকে বছরে গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। আর এই বর্ধিত বিপুল পরিমাণ সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশটিই যাবে এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক জায়ান্ট চীন ও ভারতের পকেটে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির এই প্রবল প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে ভারতের উত্থান রীতিমতো বিস্ময়কর। সিইবিআরের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে ভারত খুব শিগগিরই ৪ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অধিকারী জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে এই দুই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পার্থক্য একেবারেই নামমাত্র। অর্থনীতিবিদরা জোরালোভাবে ধারণা করছেন, জাপানের পর খুব দ্রুতই জার্মানিকে টপকে বিশ্ব অর্থনীতির তৃতীয় স্থানে উঠে আসবে ভারত। এরপর ২০২৮ সালের মধ্যেই ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছে ২০৩৬ সালের জন্য, যখন মোদির দেশের অর্থনীতি ১০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হচ্ছে। তবে মাত্র আট বছরের ব্যবধানে ৫ ট্রিলিয়ন থেকে ১০ ট্রিলিয়নে পৌঁছানোর এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। এর জন্য ভারতকে ডলারে হিসাবকৃত নমিনাল বা বার্ষিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ৯ শতাংশ হারে ধরে রাখতে হবে, যা অর্জন করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ বাস্তব প্রবৃদ্ধি, টেকসই বিনিয়োগ এবং বিপুল পরিমাণ রপ্তানি নিশ্চিত করতে হবে।
এত বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর জন্য ভারত মূলত তার বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তির ওপর নির্ভর করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের বাস্তব অর্থনীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে ভারতের শ্রমশক্তিতে মানুষের অংশগ্রহণের হার ছিল ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। তবে শুধু জনসংখ্যা থাকলেই হবে না, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রচলিত কৃষি খাত থেকে বের করে এনে উৎপাদনশীল আধুনিক শিল্প ও সেবা খাতে যুক্ত করাই এখন ভারতের প্রধান লড়াই। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভারত সরকার বর্তমানে দেশজুড়ে রাস্তাঘাট, রেলওয়ে, সমুদ্রবন্দর এবং বড় বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দ্রুততম সময়ে বন্দরে পৌঁছানোর মাধ্যমে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমিয়ে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। চীনের বাইরে যেসব পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে, ভারত তাদের নানা সুবিধা দিয়ে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে সরাসরি চীনের সঙ্গে প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দৌড়ে চীনের অবস্থান এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো। গোল্ডম্যান স্যাকসের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের দিকেই চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আবার সিইবিআরের মতে, এই পালাবদল ঘটতে পারে ২০৪৫ সালের দিকে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, চীনের বর্তমান অর্থনীতির আকার ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ ডলার। তবে গত কয়েক দশকে চীন যে অভাবনীয় গতিতে এগিয়েছে, সামনের দিনগুলোতে সেই গতি ধরে রাখা তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে চীনের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থাকলেও চলতি বছর তা সাড়ে ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মূলত দেশটিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া, আবাসন খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা, স্থানীয় সরকারগুলোর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদার কারণেই প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সস্তা শ্রম ও গতানুগতিক উৎপাদন কাঠামোর পুরনো মডেল দিয়ে যে আর বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়, তা চীন বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে। ফলে তারা এখন সস্তা পণ্যের কারখানার বদলে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিল্পায়নের দিকে ঝুঁকছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ, অত্যাধুনিক ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, উন্নত ভারী যন্ত্রপাতি এবং মাইক্রোচিপ গবেষণায় চীন এখন রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে, শুধুমাত্র বিদেশের বাজারে রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের ভোগ ও কেনাকাটা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে বেইজিং। কারণ, রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেকোনো দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর তুলনামূলক অবস্থান কেমন হবে, তার একটি স্পষ্ট চিত্রও এসব গবেষণায় উঠে এসেছে। সিইবিআরের মতে, ২০৪০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি হিসেবে নিজের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখবে এবং সে সময় চীন দ্বিতীয় ও ভারত তৃতীয় স্থানে থাকবে। কিন্তু ২০৪৫ সালের দিকে এই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যাবে এবং চীন আমেরিকাকে সরিয়ে শীর্ষস্থান দখল করবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি অর্থনীতির দেশ হবে যথাক্রমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জার্মানি। আর ২০৭৫ সালের দিকে গিয়ে ভারতও হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সামান্য ব্যবধানে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসবে। তবে মোট অর্থনীতির আকারে চীন ও ভারত এগিয়ে গেলেও, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, সম্পদের মূল কেন্দ্র এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তখনো তাদের আর্থিক শক্তিমত্তা বজায় রাখতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের এই পূর্বাভাস বা হিসাব-নিকাশ কোনো অপরিবর্তনীয় গাণিতিক সূত্রের মতো নিশ্চিত নয়। ২০৩৬ সালে ভারতের ১০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো কিংবা ২০৪৫ সালে চীনের শীর্ষস্থান দখলের বিষয়টি বহুলাংশে নির্ভর করছে আগামী দুই দশকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক স্থিতিশীলতার ওপর। ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল বাণিজ্য ও শুল্কনীতি। সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই দুই দেশের সম্পর্ক কেবল সহযোগিতার নয়, বরং প্রবল চাপের ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের। অন্যদিকে চীনের ঝুঁকি আরও অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বাণিজ্য যুদ্ধের পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালি, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগর নিয়ে চরম সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এসব স্পর্শকাতর অঞ্চলে কোনো সামরিক সংঘাত বাধলে তা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বীমা খরচের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, নানা রকম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, স্নায়ুযুদ্ধ এবং শুল্ক বাধা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। চীনকে তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বয়স্ক জনসংখ্যার বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। অন্যদিকে ভারতকে তার বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে একটি টেকসই ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই বিশাল পালাবদল এবং এশিয়ার পরাশক্তি হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ার ঠিক পাশেই ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থান। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির এই অভাবনীয় পরিবর্তনের যুগে বাংলাদেশ কি কেবল একজন নীরব দর্শক হয়েই থাকবে, নাকি নিজেদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নতুন কোনো বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category