কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকার প্রধানকে যেন কোনোভাবেই সাধারণ জনগণ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। তাই কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ও কঠোর প্রটোকলের কারণে যেন নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত না হয় এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি না হয়, সেদিকে এই বিশেষায়িত বাহিনীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর ৪০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এসএসএফ প্রতিষ্ঠার কালখণ্ডের তুলনায় বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বহুমাত্রিক। তিনি বলেন, “বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ও দ্রুত বিকাশের ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিত্যনতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই আধুনিক যুগে একটি বিশেষায়িত এলিট ফোর্স হিসেবে সাহস, কর্মদক্ষতা, রণকৌশল এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এসএসএফ-এর পিছিয়ে থাকার কোনোই সুযোগ নেই।” এসব আধুনিক চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে নিয়মিত আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
তরুণ বয়স থেকেই এসএসএফের কার্যক্রমের সঙ্গে নিজের পারিবারিক ও দীর্ঘদিনের পরিচিতির স্মৃতিচারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন থেকেই অর্থাৎ নিজের তরুণ বেলা থেকেই তিনি এসএসএফ-এর কার্যক্রম ও তাদের পেশাদারিত্ব খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নামাজে জানাজা আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এসএসএফ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যার জন্য তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বাহিনীকে পুনরায় আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘ বছর পর এসএসএফ-এর মূল নির্দেশিকা বা ‘রেড বুক’ (Red Book) আধুনিকায়ন করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০২ সালের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে সময়ের চাহিদানুযায়ী রেড বুকটি পুনরায় সংস্কার করে বর্তমানে আরও আধুনিক এবং যুগোপযোগী করা হয়েছে। এই সংশোধিত গাইডলাইন এসএসএফের কার্যপদ্ধতির মূল নীতিমালা প্রদানের পাশাপাশি তাদের আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, রেড বুকে উল্লেখিত নির্দেশনাসমূহ কঠোরভাবে অনুসরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগও কর্মকর্তাদের রয়েছে।
অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসএসএফ-এর নবনির্মিত সর্বাধুনিক ফায়ারিং রেঞ্জটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং বাহিনীর সদস্যদের একটি চৌকস ও রোমাঞ্চকর উদ্বোধনী মহড়া সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। পেশাগত কর্মদক্ষতা ও নিশানা নিখুঁত করতে এই ফায়ারিং রেঞ্জটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিএনপি জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব পালন করছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং সড়কে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িবহরের (মোটরকেড) আকার উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছেন। গাড়িবহর ছোট করার ফলে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে এসএসএফকে এখন জনবলের চেয়ে বুদ্ধিমত্তা ও নিরাপত্তা কৌশলের ওপর বেশি জোর দিতে হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনসভা ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে প্রটোকল রক্ষা করা কিছুটা জটিল উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, একদিকে ভিভিআইপিদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চলাচল বা স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেই এসএসএফকে তাদের আধুনিক নিরাপত্তা ছক তৈরি করতে হবে।
সবশেষে, বাহিনীর চেইন অব কমান্ড কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাধারণ জনগণ যেন কোনোভাবেই দুর্ব্যবহারের শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং দেশপ্রেমের মহৎ আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এসএসএফ আগামী দিনেও তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখবে, এটাই দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা।”