২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো একযোগে রুশ গুপ্তচর ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার এবং ক্রেমলিনসংশ্লিষ্ট একাধিক বড় কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করে। এই সাঁড়াশি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার সামরিক বাহিনী যাতে কোনোভাবেই আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে না পারে, তার পথ চিরতরে বন্ধ করা। তবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বিতাড়িত এই রুশ গুপ্তচরদের একটি বড় অংশ এখন কৌশলে জাপানে গিয়ে নতুন ঘাঁটি গেড়েছে। জাপানের অত্যন্ত দুর্বল গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী আইন এবং দেশটির বিশ্ববিখ্যাত উন্নত প্রযুক্তি খাতের সুযোগ নিয়ে মস্কো সেখানে তাদের যুদ্ধ তৎপরতার মূল নেটওয়ার্ক ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রেখেছে। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব মতে, রাশিয়ার ব্যবহার করা প্রায় ৯০ শতাংশ মিসাইল ও ড্রোনের ভেতরে জাপানি প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
টোকিওতে গড়ে ওঠা রুশ গোয়েন্দাদের এই শক্তিশালী আখড়ার নেপথ্যে রয়েছে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউয়ের (GRU) একটি অতি গোপন ইউনিট, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘২০তম ডিরেক্টরেট’ নামে পরিচিত। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এই নেটওয়ার্কের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন মাকসিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ নামের এক শীর্ষ রুশ কর্মকর্তা। তিনি মূলত রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ‘অ্যারোফ্লট’-এর টোকিও শাখার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ছদ্মবেশ ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে এই গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। এই চক্রটি ‘প্রোকো এয়ার’-এর মতো বিশ্বস্ত ও নামসর্বস্ব লজিস্টিক কোম্পানির মাধ্যমে সরাসরি রাশিয়ায় পণ্য না পাঠিয়ে ভিন্ন পথ ব্যবহার করছে। তারা মূলত ভিয়েতনাম কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো তৃতীয় দেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও স্পর্শকাতর ডুয়াল-ইউজ প্রযুক্তি (যা সাধারণ কাজের পাশাপাশি সামরিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা যায়) প্রতিনিয়ত রাশিয়ায় পাচার করে চলেছে।
ইউক্রেন এবং অন্যান্য পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো ইতিমধ্যে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির এই নজিরবিহীন অপব্যবহার এবং ইউক্রেনের মাটিতে বিধ্বস্ত রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া জাপানি চিপস ও যন্ত্রাংশের ভূরি ভূরি অকাট্য প্রমাণ হস্তান্তর করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কৌশলগত ও বাণিজ্যিক কারণে জাপান সরকার এই আন্তর্জাতিক চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে চরম ধীরগতি ও উদাসীনতা দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে টোকিওতে ক্ষমতার সাম্প্রতিক রদবদলের পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নতুন প্রশাসনের অধীনে জাপান তাদের জাতীয় গোয়েন্দা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে এবং দেশের তৈরি উন্নত প্রযুক্তির এই ধরণের বেআইনি ও চোরাই রপ্তানি রুখতে নতুন কিছু আইনি উদ্যোগ ও কঠোর নজরদারি শুরু করেছে।
সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস