• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১০ অপরাহ্ন
Headline
মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা জাহরা এল নিনোর ঝুঁকিতে লাতিন আমেরিকার লাখ লাখ শিশু : ইউনিসেফ জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা: এক বিপজ্জনক খাদের কিনারে অর্থনীতি ও জনজীবন দাদা-দাদি, নানা-নানিদের প্রতি গর্ভবতী অবস্থায় মায়েদের কোমর ব্যথায় করণীয় অক্টোবর-নভেম্বরে এলএনজির ঘাটতি নেই, আসছে ১৯ কার্গো: পেট্রোবাংলা প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ ও বৈশ্বিক সম্ভাবনার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে: মাহদী আমিন উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় কমানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ দুর্গাপূজা পালনে সকল নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা: এক বিপজ্জনক খাদের কিনারে অর্থনীতি ও জনজীবন

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও দৈনন্দিন জনজীবন আজ জ্বালানি খাতের তীব্র সংকটের কারণে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাচুর্যকে পুঁজি করে যে ‘গ্যাসভিত্তিক বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আজ পথ হারিয়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এক ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বহুমুখী সংঘাত আমাদের এই জ্বালানি-পরনির্ভরশীলতার ভয়ংকর রূপটি নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

দেশে গ্যাসের সরবরাহ সম্প্রতি সামান্য বাড়লেও তা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো সুফল নয়। বরং একটি বিকল এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের পর পুনরায় কাজে ফেরায় এই সাময়িক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কার্গো থেকে টার্মিনালে জ্বালানি স্থানান্তরে জটিলতা দেখা দিলে সেই সরবরাহ আবারও বাধাগ্রস্ত হয়। দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা যেখানে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও সর্বোচ্চ সরবরাহ করা যাচ্ছে বড়জোর ২৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুর্যোগ বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে একটি টার্মিনাল বিকল হলেই মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যাচ্ছে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সমুদ্রবন্দরগুলোতে বৈরী আবহাওয়ার সতর্ক সংকেত জারি হলে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়, তা পুরো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়। ২০১৭ সাল থেকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ভোলার মতো এলাকায় কিছু গ্যাসের সন্ধান মিললেও কাঠামোগত দুর্বলতায় তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে মূল সংকট মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

পাইপলাইনের গ্যাসে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাধ্য হয়ে দেশের প্রায় এক কোটি গ্রাহক রান্নাবান্নায় এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটে হরমুজ ও বাব-আল মান্দেব প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় এলপিজি সরবরাহও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে চলতি মাসেই এলপিজি আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার খবর মিলেছে। বাজারে সরবরাহ সংকটের এই সুযোগে ১২ কেজির সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। জ্বালানিমন্ত্রীকে আমদানিকারকরা আশ্বস্ত করলেও, চড়া দামের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরার কোনো লক্ষণ নেই।

আন্তর্জাতিক বাজারের এলএনজির চিত্র আরও ভয়াবহ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রধান সরবরাহকারী কাতার এনার্জি নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেছে। আসন্ন তীব্র শীতকে সামনে রেখে পশ্চিমা দেশগুলো আগেভাগেই গ্যাস মজুদ করতে শুরু করায় স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়ে গেছে। তীব্র অর্থ সংকটের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের পক্ষে সেই প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে কাড়াকাড়ি করে গ্যাস আনা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে চড়া দামে এলএনজি আনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ‘ক্লিন এনার্জি’ হিসেবে বিবেচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আনার ক্ষেত্রেও পাকিস্তান আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার নগ্ন রূপটি উন্মোচিত হয়েছে। আমদানি করা পারমাণবিক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা যে কতটা পলকা হতে পারে, এটি তার একটি বড় প্রমাণ।

জ্বালানির এই বহুমুখী সংকটের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প ও কৃষিতে। গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে সার উৎপাদন। আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন হবে, যা মেটাতে আমদানি নির্ভরতা আরও বাড়বে। আবার শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। এক গ্যাসের অভাবেই শিল্পে নতুন বিনিয়োগ এখন সম্পূর্ণ স্থবির, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রমাণ করছে, অস্থির আর অনিশ্চিত এই পৃথিবীতে জ্বালানির মতো মৌলিক উপাদানের জন্য অন্য দেশের ওপর শতভাগ নির্ভর করা এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমদানিনির্ভর এই কাঠামো থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা হয়তো সম্ভব নয়, তবে শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল বাড়িয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। সামষ্টিক অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে এবং ভোলার মতো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার এই বৈশ্বিক দাবা খেলায় টিকে থাকতে হলে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category