• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন
Headline
স্বস্তিতে শুরু মাধ্যমিকের লড়াই: প্রশ্নফাঁসের শঙ্কা উড়িয়ে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী বাসের ভাড়ায় আসছে সমন্বয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ‘আঞ্চলিক’ নববর্ষের রূপরেখা ত্যাগের মূল্যায়নে স্বজন-ছায়া: নারী আসনে বিএনপির ৩৬ মুখ জোটের শরিকদের ছাড়, নারী আসনে জামায়াত-এনসিপির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত গম পাচার কেলেঙ্কারি: ভোটের মুখেই ইডির তলবে বিপাকে নুসরাত ব্যাট ছেড়ে মালিকানায় ‘ইউনিভার্স বস’: স্কটিশ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনলেন গেইল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সরকারের সাশ্রয়ের বিপরীতে কতটা পুড়ছে সাধারণ মানুষ? চার দেওয়াল পেরিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার: নারী আসনের ভোটে সরগরম নির্বাচন ভবন হামের থাবায় কাঁপছে কুষ্টিয়া: একদিনে হাসপাতালে ২৮ অপহরণ, সালিশ ও ফের পলায়ন: কুমিল্লার মেঘনায় স্কুলছাত্রীকে নিয়ে ধূম্রজাল

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সরকারের সাশ্রয়ের বিপরীতে কতটা পুড়ছে সাধারণ মানুষ?

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে এক নতুন এবং গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, এবং পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ভোগ্যপণ্য—অর্থনীতির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এই মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ভর্তুকি ব্যয় হয়তো সাময়িকভাবে কমবে, কিন্তু এর জন্য সাধারণ মানুষকে যে বহুগুণ বেশি ‘সামাজিক মূল্য’ চোকাতে হবে, তা দেশের সার্বিক দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে। এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনের কারণ, সরকারের লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর বহুমুখী প্রভাবের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

মূল্যবৃদ্ধির চালচিত্র: এক নজরে নতুন দাম

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই আকস্মিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশকে পুরোপুরি এলোমেলো করে দিয়েছে।

  • ডিজেল: প্রতি লিটার ১০০ টাকা থেকে এক লাফে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

  • কেরোসিন: প্রতি লিটার ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে।

  • পেট্রোল: প্রতি লিটার ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

  • অকটেন: প্রতি লিটার ১২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধিকে অর্থনীতিবিদরা নিছক একটি রুটিন ‘জ্বালানি সমন্বয়’ হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তারা এটিকে পুরো অর্থনীতিতে একটি ভয়ংকর ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরির সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন, যার শেষ আঘাতটি গিয়ে পড়বে প্রান্তিক ভোক্তাদের ওপর।


আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বনাম দেশীয় বাস্তবতা

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামের গ্রাফ প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামের সাথে দেশের বাজারের দাম সমন্বয় না করে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে আসছিল। এতে সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছিল। একপ্রকার নিরুপায় হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে সরকার বাধ্য হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সানেম’-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান এ প্রসঙ্গে বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমে, এটি শতভাগ সত্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ তৈরি করে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত এই পুরো বোঝার দায়ভার সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত একটি দীর্ঘ ‘চেইন ইফেক্ট’ তৈরি করে, যা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ না করলে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।


আইএমএফের ঋণ: সংস্কারের চাপ নাকি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা?

জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রচ্ছন্ন চাপ রয়েছে বলে দেশের অর্থনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়টি ঝুলে আছে। সংস্থাটি বরাবরই বলে আসছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহারসহ কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ঋণ ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর মনে করেন, “এই মুহূর্তে আইএমএফের একটা বড় লোনের কিস্তি পেন্ডিং আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করছে না। সেই দিকেই হয়তো এখন একটি ধাপে ধাপে অগ্রগতি শুরু হলো। কারণ, অতিরিক্ত সাবসিডি বা ভর্তুকি দেওয়া সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে খুব বেশি বিকল্প ছিল না।”

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও একই মত পোষণ করেন। তিনি জানান, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও অর্থায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফের মূল্যায়নকে ‘নীতিগত আস্থার সনদ’ হিসেবে বিবেচনা করে।

তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি নাকচ করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১৯ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানান, “তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকারি তহবিলে প্রচণ্ড চাপ বাড়ায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, সরকার জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের বাইরে গিয়ে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের কাছে কোনো শর্তসাপেক্ষ ঋণ নেবে না।


চেইন রিঅ্যাকশন: পরিবহন থেকে বাজারের থলি পর্যন্ত

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং দৃশ্যমান প্রথম ধাক্কাটি এসে লাগে পরিবহন খাতে। দেশের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের গণপরিবহন শতভাগ ডিজেলনির্ভর।

১. গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন: ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ার সাথে সাথেই বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও নৌপথের লঞ্চের পরিচালন ব্যয় এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে। পরিবহন মালিকরা ইতোমধ্যে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বৃদ্ধির এই চাপ সরাসরি যাত্রীর ওপর পড়ে না; বরং এটি ধাপে ধাপে বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গিয়ে পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হয়।

২. কৃষকের মাঠ থেকে খুচরা বাজার: একজন কৃষক যখন তার উৎপাদিত সবজি ট্রাকে করে শহরে পাঠান, তখন ট্রাকের বর্ধিত ভাড়া সেই সবজির দাম বাড়িয়ে দেয়। এরপর আড়তদার বা পাইকারি বিক্রেতা তার মুনাফা যোগ করেন, এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতা তার পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করে ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করেন।

অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন” (Cost-push inflation) বা ব্যয়-ধাক্কা মূল্যস্ফীতি। একজন বাজার বিশ্লেষকের মতে, “জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এরপর পাইকারি দাম বাড়ে, তারপর খুচরা দাম—এভাবে একটি ধারাবাহিক চেইনে মূল্যস্ফীতি রকেটের গতিতে বাড়তে থাকে।”

৩. মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় হয়তো পণ্যের দাম কেজিতে ১ টাকা বাড়ায়, কিন্তু বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই অজুহাতে ৫ টাকা বাড়িয়ে দেয়। বাজারে স্বচ্ছতা ও নজরদারির অভাব থাকলে এই অসাধু চর্চা সাধারণ ভোক্তাকে নিঃস্ব করে দেয়।


শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা

শুধু পরিবহন বা কৃষিপণ্য নয়, শিল্প খাতেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের স্বার্থে নিজস্ব জেনারেটর (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা সরাসরি ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলনির্ভর। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক, ইটভাটা থেকে শুরু করে তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প—সবখানেই জ্বালানি একটি অপরিহার্য উপাদান বা ইনপুট। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কারখানার উৎপাদন ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়, যার পুরো দায়ভার চূড়ান্ত পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট থেকেই আদায় করে নেওয়া হয়।


সরকারের আর্থিক সাশ্রয় বনাম মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই

এখন প্রশ্ন হলো, এই জনদুর্ভোগের বিনিময়ে সরকার আসলে আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হচ্ছে? বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিসংখ্যান ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা ও ব্যবহার আনুমানিক ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি লিটারের মধ্যে ওঠানামা করে।

সরকার যদি শুধু ডিজেলে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা দাম বাড়ায়, তবে বছরে সরকারের প্রায় ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। এর সাথে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের বর্ধিত দাম হিসাব করলে সরকারের মোট আর্থিক সাশ্রয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সরকারের বাজেট ঘাটতি কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় বিশাল ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে এক নিদারুণ সামাজিক বাস্তবতা। এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে দেশের নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা। তাদের মাসিক আয় এক টাকাও বাড়বে না, অথচ খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সন্তানের শিক্ষার খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। প্রকৃত আয় বা ‘রিয়েল ইনকাম’ কমে যাওয়ার কারণে শহরাঞ্চলে বহু পরিবারকে তাদের জীবনযাত্রার মান বাধ্য হয়ে কমিয়ে আনতে হবে।


উত্তরণের উপায় ও উপসংহার

জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার একদিকে হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারছে ঠিকই, কিন্তু অপরদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি হচ্ছে বেঁচে থাকার এক নতুন সংগ্রাম। অর্থনীতির নির্মম হিসাব বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে সরকার কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও, সামাজিক বাস্তবতায় মানুষের কষ্ট ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই আকস্মিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে সরকারকে অবিলম্বে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:

  • স্বল্পমেয়াদে অন্তত আগামী তিন থেকে ছয় মাসের জন্য একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি (Social Safety Net) চালু করতে হবে।

  • ওএমএস (OMS), টিসিবির (TCB) ফ্যামিলি কার্ড এবং নগদ অর্থ সহায়তার পরিধি বাড়িয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে হবে।

  • পরিবহন ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মালিকদের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

  • পাইকারি ও খুচরা বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে মোবাইল কোর্ট ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত ও দৃশ্যমান তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে, রাষ্ট্রকে কেবল তার ব্যালেন্স শিট বা কোষাগারের হিসাব মেলালেই চলবে না; বরং সেই অর্থনৈতিক নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া সাধারণ মানুষের আর্তনাদ শোনার মতো সংবেদনশীলতাও দেখাতে হবে। ভর্তুকি কমানোর কাঠামোগত সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হলেও, স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার ঢাল নিশ্চিত করা না গেলে এই নীতি শেষ পর্যন্ত চরম সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category