• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

দক্ষতার ঘাটতি ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি: নারী শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া বেড়েছে ১৪%

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী শ্রমিক পাড়ি জমাচ্ছেন ভিনদেশে— মূলত গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া এই নারীদের চোখে থাকে সুন্দর ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ মাটিতে পা রেখেই তাঁদের সেই স্বপ্ন পরিণত হচ্ছে নিদারুণ দুঃস্বপ্নে। বিদেশ যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা, নিয়োগকর্তার সঠিক তথ্য এবং বৈধ চাকরির চুক্তিপত্র না থাকায় গন্তব্য দেশে গিয়ে তাঁরা পদে পদে ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। সেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পাশবিক যৌন হয়রানি, প্রতিশ্রুত মজুরি থেকে বঞ্চনা এবং পাসপোর্ট আটকে রেখে গৃহবন্দি করার মতো অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন রেমিট্যান্সযোদ্ধা এই নারীরা। এমনকি অনেকের স্বপ্ন শেষ হচ্ছে কফিনবন্দি লাশ হয়ে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে। ফলে পরিসংখ্যানের খাতায় বিদেশে নারী শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও তাঁদের ন্যূনতম মানবিক অধিকার ও নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তা নিয়ে সর্বমহলে এক বিরাট প্রশ্নের উদয় হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রার হার সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ সালে মোট ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী জীবিকার তাগিদে বিদেশে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বা পাঁচ হাজার ২১৪ জন নারী কর্মী বেশি বিদেশে গেছেন। এই আট মাসে ৪৮টি ভিন্ন দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী পাড়ি জমিয়েছেন, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৯০ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব ও জর্দান। এর বাইরে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভিয়েতনাম এমনকি টোঙ্গা, বাহামাস, ফিজি ও মঙ্গোলিয়ার মতো সম্পূর্ণ অপ্রচলিত ও নতুন গন্তব্যগুলোতেও বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা যাচ্ছেন। গত বছরের একই সময়ে ৫০টি দেশে ২৩ হাজার ৯৩৬ জন নারী শ্রমিক গিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারে বাংলাদেশি নারীদের গন্তব্যের পরিধি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

২০০৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা শুরু হলেও মূলত ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গৃহকর্মী পাঠানোর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরই এই সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত থাকলেও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি-এর কাছে নেই। তবে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী চরম শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক তথ্য হলো, ২০২১ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে ৪১২ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম বা ওকাপ-এর এক গভীর গবেষণায় ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের এক ভয়ংকর ও লোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে।

ওকাপ-এর ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবাসে যাওয়া ৯৪ শতাংশ নারীই নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ৪৭ শতাংশ নারী পাশবিক যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। অসুস্থ হলে ৯৭ শতাংশ নারী ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং ৮০ শতাংশ নারীকে নিয়মিত পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়নি। ৮২ শতাংশ নারীকে অমানবিক পরিশ্রমে বাধ্য করে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খাটানো হয়েছে এবং ১৫ শতাংশ নারীকে খাবার বা পানি ছাড়া অন্ধকার ঘরে আটকে রাখার মতো বর্বরতা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ৯৭ শতাংশ নারী কোনো সাপ্তাহিক ছুটি পাননি বলে জানিয়েছেন। এই চরম দুর্দশার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আনুষ্ঠানিক চাকরির চুক্তিপত্রের অভাবকে। দেশ ছাড়ার আগে বেশির ভাগ নারী শ্রমিকই কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তিপত্র হাতে পান না, ফলে বিদেশে গিয়ে কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা বা বেতন নিয়ে কোনো বিরোধ তৈরি হলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার মতো কোনো কার্যকর প্রমাণ তাঁদের হাতে থাকে না।

নারী শ্রমিকদের এই চরম নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি খোদ জাতীয় সংসদেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ সংসদে দাঁড়িয়ে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে তাঁদের মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানান। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে, অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে এক শ জন নারী রেমিট্যান্সযোদ্ধা লাশ হয়ে ফিরছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি প্রবাসী নারী কর্মীদের সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক হটলাইন, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা সেফ হোম, জীবনবীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার সঠিকতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার জোর দাবি জানান।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এসব অভিযোগ ও দাবির জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নারী শ্রমিকদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য ১৬১৩৫ নম্বরের একটি টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রাখা হয়েছে, যেখানে দেশের বাইরে থেকেও কর্মীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। এরই মধ্যে ১০টি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং সৌদি আরবে দুটি সেফ হোম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও বেশ কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে সেফ হোম চালুর কাজ এগিয়ে চলছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান যে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবিষয়ক চুক্তি ও সমঝোতা বাড়ানোর ফলে এখন নির্যাতনের শিকার কর্মীরা আইনি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ পাচ্ছেন— পাশাপাশি নারী কর্মীদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ওপর সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে।

অভিবাসন খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা নারী শ্রমিকদের এই দুরবস্থার পেছনে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য ও দক্ষতার অভাবকে প্রধানত দায়ী করছেন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নারী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সে রাষ্ট্র আর্থিকভাবে লাভবান হলেও তাঁদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত নারীরা দালালদের উচ্চ বেতন ও ভালো কাজের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ভুলে বিদেশে গিয়ে অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এমনকি অনেক সময় প্রেম বা বিয়ের ফাঁদে ফেলেও নারীদের বিদেশে পাচার করার মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে বলে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করেন।

অন্যদিকে প্রখ্যাত অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, বিদেশের শ্রমবাজারের তুমুল প্রতিযোগিতার জন্য আমাদের নারীরা ভাষাগত ও কারিগরি দিক থেকে মোটেও প্রস্তুত নন। দক্ষতার চরম ঘাটতি থাকায় তাঁরা মূলত গৃহকর্মী বা অনানুষ্ঠানিক খাতেই আটকে থাকছেন, যেখানে নির্যাতনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো যেভাবে তাদের নারীদের নার্সিং বা পরিচর্যার মতো সম্মানজনক কাজে প্রশিক্ষিত করে অদক্ষ গৃহকর্ম থেকে বের করে আনছে, বাংলাদেশেরও উচিত অবিলম্বে সেই মডেল অনুসরণ করা। প্রবাসে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বিদেশ যাওয়ার আগে ভাষা, কাজের দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category