• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি ক্রোকের রূপরেখা আসছে

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং সেই অর্থ জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে নিজেদের কার্যপ্রণালী বিধি বা ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে আদালত| এই আইনি সংস্কার সম্পন্ন হলে তা ভুতাপেক্ষ বা পেছনের সময় থেকে কার্যকর করা হবে| এর ফলে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অন্যান্য আসামিদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ও তা থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি অস্পষ্টতা বা জটিলতা থাকবে না| ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এই যুগান্তকারী আইনি সংস্কারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম|
চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত মূল আইন ও বিদ্যমান বিধিমালার মধ্যে আসামির সম্পত্তি ক্রোক, বাজেয়াপ্ত কিংবা জরিমানা করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মৌলিক ধারা উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতি বা ফ্রেমওয়ার্ক ছিল না| মূলত কোন সরকারি দপ্তর বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সরকারের হেফাজতে যাবে, কীভাবে তা নিলাম বা বিক্রি করা হবে এবং আদায় করা অর্থ কীভাবে ভুক্তভোগীদের তহবিলে জমা হবে—বিধিতে এই রূপরেখাটি বিস্তারিত ছিল না| ট্রাইব্যুনাল-২-এর একটি মামলার কার্যক্রমে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই প্রশাসনিক শূন্যতার দিকটি আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়| এই জটিলতা নিরসনে দেশের প্রচলিত ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ এবং ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা’র সম্পত্তি নিলাম ও জরিমানা আদায়ের স্বীকৃত পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধিতে সুস্পষ্ট ধারা সংযোজনের কাজ চলছে|
এই আইনি সংস্কার চূড়ান্ত হলে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একটি সুস্পষ্ট ও প্রশ্নাতীত নির্দেশনার অধীনে কাজ করতে পারবে| পুরো বিষয়টি আরও সুচারু ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ট্রাইব্যুনালের উভয় আদালতের বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি বিশেষ সেমিনার আয়োজনেরও প্রস্তুতি চলছে| সেমিনারে সার্বিক আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন ও বাজেয়াপ্তি প্রক্রিয়ার একটি টেকসই খসড়া চূড়ান্ত করা হবে, যাতে কোনো আইনি ফাঁকফোকর অবশিষ্ট না থাকে|
জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের মামলায় ট্রাইব্যুনাল থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘোষণা আসার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঠিক কোন কোন সম্পদ সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যাবে| ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে মোট চার কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন| আইন অনুযায়ী বিধিমালার সংশোধন শেষ হলে তার একক মালিকানায় থাকা এসব সম্পদ সরাসরি রাষ্ট্রের অনুকূলে ক্রোক বা প্রকাশ্য নিলামে তোলার প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়বে|
এই তালিকার মধ্যে প্রধান অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত থাকা দুই কোটি ৩৯ লাখ টাকা, বিভিন্ন মেয়াদে কেনা ২৫ লাখ টাকার জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর| এছাড়া তাঁর মালিকানাধীন সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের দুটি ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি, উত্তরাধিকার ও ক্রয়সূত্রে পাওয়া ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার এবং সাত লাখ ৪০ হাজার টাকার গৃহস্থালি আসবাবপত্রও বাজেয়াপ্তের তালিকায় যুক্ত হবে| স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, গাজীপুর এবং রংপুরের বিভিন্ন মৌজায় ছড়িয়ে থাকা ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি, ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে তাঁর নিজের নামে অনুমোদিত ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা মূল্যের ১০ কাঠার একটি আবাসিক প্লট এবং টুঙ্গিপাড়ায় তিন তলা বাড়িসহ ৬ দশমিক ১০ শতক বসতভিটা সরাসরি নিলাম বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার যোগ্য সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে|
হলফনামায় দেওয়া হিসাবের বাইরেও অতীতে গোপন রাখা বা বেনামে থাকা সম্পদের বিষয়ে তদন্ত সংস্থাগুলোর নজর রয়েছে| দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা মাত্র সাড়ে ৬ একর জমি দেখালেও পরবর্তীতে দুদকের নিবিড় তল্লাশিতে তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ২৮ একর ৪১ শতক স্থাবর জমির সন্ধান মেলে| প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে গঠিত তদন্তকারী দল যদি তাঁর গোপনকৃত বা বেনামে পরিচালিত অন্য কোনো একক সম্পদের প্রমাণ পায়, তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেগুলোকেও সরকারি বাজেয়াপ্তের আওতায় যুক্ত করা হবে|
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, চাইলেই শেখ পরিবারের সব সম্পত্তি একযোগে ট্রাইব্যুনালের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব নয়| ফৌজদারি আইন ও আদালতের সাধারণ নীতি অনুযায়ী, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির অপরাধের দায়ে কেবল তাঁর ‘একক ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন’ সম্পত্তিই বাজেয়াপ্ত করা চলে| শেখ পরিবারের মালিকানাধীন অন্যান্য বহুল আলোচিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনি জটিলতা বিদ্যমান রয়েছে| যেমন ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িটির প্রত্যক্ষ মালিক শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে নন; এটি সম্পূর্ণভাবে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর অধীনে নিবন্ধিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পত্তি| কোনো ট্রাস্টের মালিকানাধীন সম্পদ ট্রাইব্যুনালের একক আদেশে ব্যক্তির অপরাধের দায়ে ক্রোক করা আইনত সম্ভব নয়|
একইভাবে ধানমন্ডির পারিবারিক বাসভবন ‘সুধা সদন’-এর আইনগত মালিকানা শেখ হাসিনার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে নথিভুক্ত রয়েছে| অন্যদিকে গাজীপুরের মৌচাকে অবস্থিত প্রায় ৯ বিঘা আয়তনের সুবিশাল বাগানবাড়িটির মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যে যৌথভাবে বণ্টিত| এছাড়া রাজধানীর পূর্বাচলে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিশেষ কোটায় বরাদ্দ নেওয়া মোট ৬০ কাঠা প্লটের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের আলাদা মামলা চলমান রয়েছে|
আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিবারের অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য বা যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে সরাসরি ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ কার্যকর হবে না, যদি না পৃথক বিচার বিভাগীয় তদন্তে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে ওই সম্পদগুলো অপরাধলব্ধ অর্থে বেনামে কেনা হয়েছে| ফলে সংশোধিত বিধিমালার অধীনে কেবল দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্রত্যক্ষ ও একক মালিকানাধীন সম্পদগুলো চিহ্নিত করেই নির্বাহী বিভাগ নিলামের মাধ্যমে তহবিল গঠন করবে এবং জুলাই ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে সেই অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হবে|
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category