• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন

নিজেদের চামড়া ফেলে চড়া দামে আমদানির আত্মঘাতী নীতি

Reporter Name / ১১৯ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের চামড়া খাতের এক অদ্ভুত এবং আত্মঘাতী বৈপরীত্যের চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায়। বিশ্বের অন্যতম সেরা মানের কাঁচা চামড়া উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় প্রতি বছর আমাদের উৎপাদিত চামড়ার প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অবহেলায় ফেলে দিতে হয় কিংবা তা নানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এক চরম পরিহাসের বিষয় হলো, পশ্চিমা দেশগুলোতে জুতো ও ব্যাগের মতো চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করার উদ্দেশ্যে আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তাদের সেই কাঁচা চামড়াই আবার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া মূল্যে আমদানি করতে হচ্ছে। এই কাঠামোগত সংকটের কারণে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই খাতের রপ্তানি আয় গত বহু বছর ধরে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে আটকে আছে। এর বিপরীতে ভিয়েতনামের মতো দেশে নিজস্ব কোনো কাঁচা চামড়া উৎপাদিত না হওয়া সত্ত্বেও তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের চামড়া আমদানি করে এবং তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এই খাতের তীব্র সম্ভাবনা এবং বর্তমান বিপর্যয় নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ গভীর বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

পোশাক খাতের চেয়েও বেশি মূল্য সংযোজনের হাতছাড়া সম্ভাবনা

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিসিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এই খাতের সম্ভাবনা নিয়ে এক চমকপ্রদ তুলনা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে যেখানে সর্বোচ্চ ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন করা সম্ভব হয়, সেখানে চামড়া খাতে অবলীলায় ৯০ শতাংশের বেশি দেশীয় মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। অর্থাৎ এই খাতটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা পোশাক খাতকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদের অভাব এবং বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স বা পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারা। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর বৈশ্বিক চামড়ার বড় বড় বাজারগুলো হারাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হতে যাচ্ছে কারণ আগামী ২০২৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশ রক্ষায় কার্বন ট্যাক্সের মতো কঠোর ও নতুন নিয়ম যুক্ত হতে যাচ্ছে, যার জন্য আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই সামান্য।

সাভার ট্যানারির মহাবিপর্যয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজাল

চামড়া শিল্পের এই পদ্ধতিগত ধ্বংসের পেছনে বিগত সরকারের নীতিহীনতা ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানিকে সরাসরি দায়ী করেছেন জেনিস সুজের চেয়ারম্যান নাসির খান। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, বিগত প্রশাসন কখনোই মন থেকে চায়নি এই পরিবেশবান্ধব খাতটি স্বাবলম্বী হয়ে ঘুরে দাঁড়াক। সরকার এক দশকেরও বেশি সময় আগে হাজারো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প নগরী স্থানান্তর করেছিল এক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, গত দশ বছরেও সাভারে একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি (CETP) নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কোনো কোনো দূরদর্শী দেশীয় কোম্পানি নিজস্ব অর্থায়নে ব্যক্তিগত ইটিপি স্থাপন করতে চাইলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাদের টানা সাত বছর হাইকোর্টের বারান্দায় দৌড়াতে হয়েছে।

এছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেশে এক চরম নৈরাজ্য চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভিয়েতনামের মতো বিশ্বসেরা রপ্তানিকারক দেশে মাত্র পাঁচটি লাইসেন্স নিয়ে অনায়াসে ব্যবসা পরিচালনা করা গেলেও বাংলাদেশে একজন উদ্যোক্তাকে ৩০টি ভিন্ন লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয় এবং প্রতি বছর সেগুলো নবায়ন করতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। এই প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বের কারণে ২০১৭ সালে ভিয়েতনামের এক বিলিয়ন ডলারের একটি বড় চামড়া পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে এসেও শেষ পর্যন্ত ফিরে যায়। ফিরে যাওয়ার সময় তারা স্পষ্ট বলে গিয়েছিল যে, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ও সরকার নিজেই চায় না এখানে কোনো নতুন শিল্প বা ব্যবসা গড়ে উঠুক।

নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক বায়ারদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া

এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রযুক্তিগত দিকটি তুলে ধরে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার ও ফুটওয়্যার রপ্তানিকারক সমিতির চেয়ারম্যান টিпу সুলতান জানান, সাভারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত নিম্নমানের চাইনিজ যন্ত্রপাতি দিয়ে সিইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে সাভারের ট্যানারিগুলো বৈশ্বিক বড় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে যে প্রক্রিয়াজাত চামড়া আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট আড়াই থেকে তিন ডলারে বিক্রি হতো, এখন তার আন্তর্জাতিক মূল্য নেমে এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেন্টে। বৈশ্বিক বাজারে এই নজিরবিহীন দরপতনের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে, বিশেষ করে প্রতি বছর পবিত্র কোরবানি ঈদের সময় পশুর কাঁচা চামড়ার দামে যে চরম বিপর্যয় দেখা যায় তার মূল কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে।

ব্যাংক ঋণ সংকট ও কোরবানির চামড়া ধ্বংসের ট্র্যাজেডি

কোরবানির ঈদের সময় মাঠপর্যায়ে কাঁচা চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে লাখ লাখ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলা বা নষ্ট হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো ট্যানারি মালিকদের তীব্র তারল্য ও আর্থিক সংকট। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ এই খাতের ব্যাংকিং সহায়তার এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, পূর্বে এই খাতের জন্য বরাদ্দকৃত ব্যাংক ঋণের পরিমাণ যেখানে ৪৬০ কোটি টাকা ছিল, তা বর্তমানে রহস্যজনকভাবে কমিয়ে মাত্র ৬৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এই তীব্র অর্থ সংকটের কারণে ট্যানারি মালিকেরা উৎসবের মৌসুমে মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত চামড়া নগদ মূল্যে সংগ্রহ করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত পুঁজি ও ক্রেতার অভাবে এবারও দেশের মোট উৎপাদিত ছাগলের চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য চরম আত্মঘাতী।

ধলেশ্বরী নদী রক্ষা ও আগামী এক বছরের মহাপরিকল্পনা

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এই মহা-সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের প্রতি এক জরুরি ও কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপির সমস্যার সমাধান আগামী এক বছরের মধ্যে এবং বিশেষ করে আসন্ন কোরবানি ঈদের আগেই যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।

“অতীতে বুড়িগঙ্গা নদীকে যেভাবে ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, বর্তমানে সাভারের ধলেশ্বরী নদীর ক্ষেত্রেও একই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ধলেশ্বরী নদীকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।”

এই প্রক্রিয়ায় আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন জানান, চামড়া খাতের এই সুপ্ত সম্ভাবনাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে কৃষি ব্যাংক বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচী গ্রহণ করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এই খাতের জন্য একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের জোর চেষ্টা চালাবে। একই সাথে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মন্ডল পরামর্শ দেন যে, আগামী এক বছরের মধ্যে আধুনিক লবণকরণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার করে চামড়ার বার্ষিক অপচয়ের হার অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনার একটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট নির্ধারণ করা উচিত। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ওয়েবিনারের বক্তারা একমত হয়েছেন যে, ঈদে চামড়ার পচন রোধ এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হলে বিশ্ববাজারে উচ্চ মূল্যে চামড়া রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে হবে। আর এটি অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ক্রেতাদের বেঁধে দেওয়া আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড শতভাগ পূরণ করা, যেখানে রাষ্ট্রকে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category