সেদিন প্রবল উত্তেজনায় ঘুম ভাঙলো।
মাত্র ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। আকাশ লাল মরিচের মতো। পাখিরা ডানা ঝাপটে বের হয়ে আসছে। কিন্তু কিছুই আকর্ষণ করছে না। বুকের ভেতর চাপা অস্থিরতা।
পেয়ালায় কফি ঢালতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললাম।
আজ পলিন আসবে। সকাল এগারোটায়।
পুরো নাম পলিন এমারসন।
একটি আন্তর্জাতিক চ্যারেটির অ্যাম্বেসেডর। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারটা দেখে।
গত কয়েকমাস থেকে তার সাথে বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে মেইল আর ভিডিও কনফারেন্সে যোগাযোগ হয়েছে। সে কাজ করবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে। তাদের উপর বিস্তারিত রিপোর্ট, কী কী সাহায্য করা যায়, বিশেষ করে শিশু শিক্ষা, এগুলোই তার অ্যাজেন্ডা।
আমাকে অফিস থেকে তার সাথে কোঅর্ডিনেট করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ যোগাযোগ আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছে গভীর বন্ধুত্ব।
ব্যাপারটা নিয়ে অফিসে গুঞ্জনও শুরু হয়েছে।
কারণ পলিন এমারসন সাধারণ কেউ নয়। আমেরিকার বিখ্যাত টিভি অ্যাংকর ছিল।
অস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান পরিচালনায় তাকে প্রতি বছর দেখা যেত।
হলিউডের একটি মিষ্টি ছবি ‘আ লোনলি উইম্যান অন দ্য বিচ’ ছবিতে অভিনয়ও করেছিল। কিন্তু কেন যেন অসম্ভব ভালো ছবিটি তেমন হিট করেনি।
তারপর সব ছেড়েছুড়ে সে চ্যারেটিতে নাম লেখায়।
কিন্তু তার চেহারা বিলিয়ন লোকের মগজ থেকে মুছে যায়নি।
সব মিলিয়ে পলি এমারসন অতি বিখ্যাত মানুষ।
আ ভেরি হাই স্টেইক টু হ্যান্ডেল।
আজ তার সাথে দেখা হবে! উত্তেজনাটা গরম কফিতে হাত পুড়িয়ে ফেলার মতোই।
এমিরেটসের স্লোগান হচ্ছে ‘জাস্ট অন টাইম’। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সকাল এগারোটায় তাদের ফ্লাইট ঢাকার মাটি স্পর্শ করল।
কিন্তু সব ফরমালিটি শেষ করে পলিন বেরিয়ে এলো প্রায় বেলা বারোটায়।
ইন্টারনেটের কারণে এখন আর আগের মতো অপরিচিত কারোর জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে এয়ারপোর্টে অ্যারাইভাল লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে হয় না। আগেই চেহারা চেনা হয়ে যায়।
পলিন যখন অ্য্যারাইভালে এসে পৌঁছালো তখন মনে হলো নাম না জানা কোনো অসম্ভব সুন্দর ফুল হেঁটে আসছে। তবে ফুলটি জংলি ফুল, এক ধরনের বুনো সৌন্দর্য উপচে পড়ছে, ঠিক গোলাপের মতো স্নিগ্ধ নয়, গভীর জঙ্গলে ফোটা বেপরোয়া এক ফুল।
সে সোজা হেঁটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাগ করলো। আমি একটু অস্বস্তি অনুভব করছি। কোনো মহিলা প্রকাশ্যে হাগ দিচ্ছে, এটা আমাদের কালচারের সাথে খুব বেশি যায় না। সবাই একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
পলিনের গা থেকেও ভেসে আসছে জংলি ফুলের সুবাস। মনে হচ্ছে সে ‘ক্রিড’ মেখেছে। গত আড়াইশো বছর ধরে এ পারফিউমটি ব্রিটেনের রাজদরবারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মাত্র ষাট মিলিগ্রামের দাম আমার এক মাসের বেতনের চাইতেও বেশি। কিন্তু সে পরেছে সাধারণ ফতুয়া আর জিন্স। ফতুয়াটা আমিই পাঠিয়েছিলাম। ও বলেছিল, বাংলাদেশি পোশাক পরে আসতে চায়।
“সৈয়দ, হাউ আর ইউ, লুকিং ফ্রেশ।”
“ফাইন অ্যান্ড ইউ লুক গর্জিয়াস।”
“হাহাহাহা। তবে সত্যি বলতে কী তুমি আরেকটু হ্যান্ডসাম হবে আশা করেছিলাম। হাহাহাহা।”
“আই আম সরি, অ্যাট দা টাইম অফ মাই বার্থ গড হ্যাড থ্রোন মি ইন টু দ্যা ব্ল্যাক সি। জন্মের সময় উপরওয়ালা আমাকে কৃষ্ণ সাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাই গায়ের রঙের উপর আমার হাত নেই। হাহাহা।”
“ইউ আর নটি, ভেরি নটি।”
ঠিক সে মুহূর্তে আমরা আরো অনেক গভীর বন্ধু হয়ে গেলাম। এটা ইন্টারনেটের বন্ধুত্ব নয়, নিঃশ্বাসের দূরত্বের বন্ধুত্ব।
যে মেয়ে প্রথম দেখায় ‘তুমি হ্যান্ডসাম নও’ বলার সরলতা ধারণ করে তার সাথে বন্ধুত্ব না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
কক্সবাজারের কানেক্টিং ফ্লাইট ছিলো দেড়টায়। মোটামুটি তিনটার দিকে আমরা উখিয়ায় আমাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছালাম।
সমুদ্র মুখে রেখে মাঝারি সাইজের ডুপ্লেক্স বাংলো।