• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজি বাজার: সরকারি মূল্যকে বুড়ো আঙুল

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

রান্নাঘরের অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি নিয়মিতভাবে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ছে না। খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে ডিলাররা সরকারি নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট ও অতিমুনাফার খেসারত দিতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের পকেট প্রতিনিয়ত খালি হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি থাকা সত্ত্বেও এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই মূল্যবৃদ্ধির মহোৎসব শুরু করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য কিছুতেই থামছে না।

ভোক্তাদের অভিযোগ, বিইআরসি দাম বাড়িয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার পরও তা বাজারে কার্যকর হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিইআরসি প্রতি কেজিতে এক লাফে ২১ টাকা দাম বাড়িয়ে ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডারের দাম আগের চেয়ে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও এই সরকারি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানভেদে এবং কোম্পানির ভিন্নতা অনুযায়ী সাধারণ ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে শুরু করে ২ হাজার ৫০০ টাকারও বেশি দামে। কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা কেজিতে অন্তত ৭৬ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য আদায় করেছেন। এমনকি ৩৩ কেজির বড় সিলিন্ডারগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য ৫ হাজার ৫১ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তা বিক্রি করা হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। রাজধানী ছাড়াও টাঙ্গাইল, ভোলা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খুচরা বাজারেও একই চিত্র বিরাজ করছে, যেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।

এই কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ডিলার, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। বিক্রেতারা অভিযোগ করছেন যে, আমদানিকারক কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কারণেই বাজারে এই কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন স্তরের এই কারসাজিকে সম্পূর্ণ দায়ী করছেন সাধারণ ক্রেতারা। তবে বিইআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশের মাসিক সর্বোচ্চ চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্যাস আমদানি করা হয়েছে, যেখানে দৈনিক প্রায় ৫ হাজার টন বা ৫০ লাখ কেজি এলপিজি বিক্রি হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত রহস্যজনক। বিইআরসি ইতিমধ্যে লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে এবং আমদানিকারক, পরিবেশক কিংবা ডিলার—কোন পর্যায়ে এই অনিয়ম বা সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে নিজস্ব তদন্ত ও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

বাজার পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩২টি কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে এলপিজি আমদানি ও সিলিন্ডারে ভরার বা বটলিং করার বৈধ লাইসেন্স পেয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও চলতি মাসে মাত্র ১২টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এদিকে টাঙ্গাইলসহ কিছু এলাকায় জেএমটিআইয়ের মতো কিছু কোম্পানি গত দুই মাস ধরে তাদের সিলিন্ডার সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে, যার ফলে সেখানে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে এবং সুযোগ বুঝে দুই হাজার ১০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে। টাঙ্গাইল জেলা এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারনির্ধারিত ১ হাজার ৭৪২ টাকায় ডিলার পর্যায়ে কিনলেও কোম্পানিগুলো কোনো ধরনের পরিবহন খরচ বা ট্রাকভাড়া বহন করে না। ফলে পরিবহন খরচ, লোড-আনলোড, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মচারীদের বেতন মিলিয়ে প্রতি সিলিন্ডারে সর্বনিম্ন একশ টাকা অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। এর বাইরে গ্যাস নিয়ে আগাম কারসাজির একটি তথ্যও উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, এলপিজির দাম সামনে আরও বৃদ্ধি পাবে—এমন অভ্যন্তরীণ খবর আগে থেকেই পেয়ে অসাধু ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন স্তরে কৃত্রিম উপায়ে পণ্য মজুদ বা সিন্ডিকেট করে রেখেছেন। পাশাপাশি বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোও তাদের নিজস্ব প্ল্যান্ট থেকে বাজারে তুলনামূলক কম গ্যাস ছাড়ছে, যা সামগ্রিক অনিয়ম ও মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

কারা এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তা চিহ্নিত করতে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন যে, তারা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে কাজ করছেন এবং অচিরেই এর পেছনের মূল হোতাদের খুঁজে বের করা হবে। এদিকে কারিতাস ও অন্যান্য স্থানীয় সংস্থার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, এই অস্থিতিশীল বাজারে সাধারণ মানুষ চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের এই লাগামহীন অতিমুনাফা এবং কারসাজির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘরের বাজেট পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে। সংকট নিরসনে শুধু কাগজে-কলমে বৈঠক বা নামমাত্র নোটিশ না দিয়ে সরবরাহ লাইনের প্রতিটি স্তরে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের পকেট কাটা বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না এবং এলপিজির এই কৃত্রিম সংকট ভোক্তাদের দুর্ভোগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category