• শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন

পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৭০ হাজার কোটি নিয়ে গেছে বিদেশি কোম্পানি

Reporter Name / ৪৯ Time View
Update : শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই সব সময়ই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো যখন এ দেশে বিনিয়োগ করে, তখন শুধু মূলধনই আসে না, তার সাথে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগও তৈরি হয়। তবে ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য যেহেতু মুনাফা অর্জন, তাই এই বিদেশী কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ প্রতি বছরই তাদের নিজ নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন বা স্থানান্তর করে থাকে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা করে বিদেশী কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করছে এবং সেই মুনাফা সাফল্যের সাথে তাদের নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত) এ দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী দুই শতাধিক বিদেশী কোম্পানি লভ্যাংশ, মুনাফা ও অন্যান্য আয় হিসেবে মোট ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন বা ৬১৫ কোটি মার্কিন ডলার তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করেছে। বাংলাদেশী মুদ্রার বর্তমান গড় বিনিময় হারের ভিত্তিতে হিসাব করলে এই বিপুল অঙ্কের প্রত্যাবাসনকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রত্যাবাসনের শীর্ষে অবস্থান করছে মূলত পাঁচটি খাতের কোম্পানি—টেলিযোগাযোগ, তেল-গ্যাস-খনিজ ও বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ব্যাংক-বীমা ও লিজিং এবং অন্যান্য বৃহৎ ভোগ্যপণ্য খাত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি বেশ চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছে। দেশে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন, রয়্যালটি ফি পরিশোধ এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বেশ জটিল সমস্যার মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। করোনা মহামারির প্রভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রত্যাবাসনের পরিমাণ ছিল ১৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা তৎকালীন গড় বিনিময় হার অনুসারে ছিল ১২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। কিন্তু এর ঠিক পরের বছরই, অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে যখন ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করে এবং ডলারের বিনিময় হার ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে লাফিয়ে ১০৬ টাকায় উঠে যায়, তখন অর্থ প্রত্যাবাসন প্রায় ৫২ শতাংশ কমে মাত্র ৬৬ কোটি ৫ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রত্যাবাসনের পরিমাণ আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং তা বেড়ে ১১১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই প্রত্যাবাসনের পরিমাণ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায় এবং তা ১৫২ কোটি ৪৩ লাখ ডলারে (১৮ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা) গিয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই প্রত্যাবাসনের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে সামান্য (প্রায় ৪ শতাংশ) কমে ১৪৬ কোটি ৩ লাখ ডলারে (১৭ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা) এসে দাঁড়িয়েছে।

ডলার সংকটের সময় মুনাফা প্রত্যাবাসনে যে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা জানান যে, মূলত ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে ডলারের তীব্র সংকট শুরু হয় এবং ২০২৩ সালে তা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের কারণে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর অনেক নামিদামি বিদেশী কোম্পানি তাদের অর্জিত মুনাফা প্রত্যাবাসন করতে পারেনি। তাছাড়া দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকেও সেসময় অর্থ প্রত্যাবাসনের ওপর কিছু সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে অর্থনীতির চাকা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুনাফা প্রত্যাবাসনের ওপর থেকে এই বিধিনিষেধগুলো শিথিল করে দেয়। এর ফলে ২০২২ সালসহ পরবর্তী তিন বছরের আটকে থাকা পুঞ্জীভূত মুনাফাও গত বছর প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয় এবং ঠিক এই কারণেই মূলত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যাবাসনকৃত অর্থের পরিমাণ দেড় বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্ক ছাড়িয়ে যায়।

বিদেশী কোম্পানিগুলোর এই বিপুল পরিমাণ মুনাফা প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনোভাবেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে না, বরং একে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা হিসেবেই বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর এত বিপুল পরিমাণ মুনাফা প্রত্যাবাসন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এ দেশে বিনিয়োগ করলে ব্যবসা সফল হওয়া এবং ভালো মুনাফা করা সম্ভব। তিনি বিশ্বের অন্যান্য বিদেশী কোম্পানিগুলোকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, এখানে ব্যবসা উপযোগী একটি অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশ, সম্ভাবনাময় খাত এবং কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে। একই সাথে তিনি বিদেশী কোম্পানিগুলোর এই অভূতপূর্ব সাফল্য এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, বিদেশী কোম্পানিগুলো শুধু মূলধনই আনে না, বরং তাদের হাত ধরে দেশে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনারও আগমন ঘটে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উচিত বিদেশী কোম্পানিগুলোর এই সফল মডেল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজেদের ব্যবসায়ে তা প্রয়োগ করা, এতে করে দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের শীর্ষে থাকা কোম্পানিগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে আছে। দেশের বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলো নরওয়েভিত্তিক টেলিনর মোবাইল কমিউনিকেশনস এএস। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০০২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছরে গ্রামীণফোন থেকে টেলিনর লভ্যাংশ হিসেবে মোট ২২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। একইভাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলো মালয়েশিয়ার আজিয়াটা গ্রুপের শাখা আজিয়াটা ইনভেস্টমেন্টস (লাবুয়ান) লিমিটেড এবং ২৮ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলো সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভারতী ইন্টারন্যাশনাল। গত পাঁচ অর্থবছরে টেলিযোগাযোগ খাত থেকে অর্থ প্রত্যাবাসনের শীর্ষ তালিকায় এই দুটি কোম্পানির নামও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

তেল, গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে অর্থ প্রত্যাবাসনে সম্পূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ। তারা উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) আওতায় দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্র বিবিয়ানাসহ জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাস ক্ষেত্র পরিচালনা করে এবং উৎপাদিত সব গ্যাস ও কনডেনসেট পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং কনডেনসেটের ৮৩ শতাংশই উৎপাদন করে এই শেভরন। এই খাতে অর্থ প্রত্যাবাসনে আরও যারা শীর্ষ তালিকায় রয়েছে তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জাপানের জেরা এবং ভিক্টোরিয়া হোল্ডিংস বি.ভি. অন্যতম। অন্যদিকে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষ প্রত্যাবাসনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আর-প্যাক ইন্টারন্যাশনাল, শ্রীলংকার ইউনিচেলা (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং নেদারল্যান্ডসের পাক্সার বি.ভি.-এর নাম উল্লেখযোগ্য।

ব্যাংক, বীমা ও লিজিং খাতের শীর্ষ প্রত্যাবাসনকারীদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় বিদেশী ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড (লন্ডন), বৃহত্তম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (আলিকো/মেটলাইফ) এবং হংকংয়ের এএসপি ফিন অ্যাসেট অ্যান্ড লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট। এছাড়া অন্যান্য খাতের মধ্যে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ে জড়িত যুক্তরাজ্যের ইউনিলিভার ইউকেসিআর লিমিটেড, তামাক খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মূল শেয়ারহোল্ডার দ্য র‍্যালে ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং ভারতের ম্যারিকো লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি ম্যারিকো বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রত্যাবাসন করেছে। শুধু ম্যারিকো বাংলাদেশই গত পাঁচ বছরে তাদের ভারতীয় মূল কোম্পানির কাছে লভ্যাংশ বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ প্রত্যাবাসন করেছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়ও কিছুটা পড়তে শুরু করেছে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী মনে করেন যে, দেশের বর্তমান সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফা প্রত্যাবাসনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমে আসতে পারে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ বিদেশী বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন যে, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশে কেবল মূলধন নিয়ে আসে না, তারা আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং রফতানির ক্ষেত্রে নতুন পণ্য ও বাজার সৃষ্টির পথও দেখায়। দেশের তৈরি পোশাক খাত একসময় বিদেশীদের হাত ধরেই এসেছিল এবং পরবর্তীতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সেই মডেল অনুসরণ করে বিশাল সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশের অর্থনীতিকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নিতে এবং এসএমই খাতে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন লিংকেজ তৈরি করতে হলে বাংলাদেশে আগামীতে আরও অনেক বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কোনো বিকল্প নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category