পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভেসে যাওয়া মেঘের ভেলা, সুবিশাল সবুজ উপত্যকা এবং আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সারা বছরই সারা দেশ থেকে হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে যান সাজেক ভ্যালিতে। রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই পাহাড় চূড়ার পর্যটন কেন্দ্রটি বিগত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সাজেকে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে শতাধিক চোখধাঁধানো কটেজ, রিসোর্ট ও আধুনিক রেস্তোরাঁ। কিন্তু সম্প্রতি পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দফায় দফায় ডাকা সড়ক অবরোধ, রাজনৈতিক বৈরিতা এবং সহিংস সংঘাতের কারণে সাজেকের গতিশীল পর্যটন শিল্পে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক নেমে এসেছে। ভ্রমণ মৌসুমের শুরুতেই আকস্মিক সহিংসতা এবং পর্যটকদের গণহারে বুকিং বাতিল ও অগ্রিম টাকা ফেরত নেওয়ার হিড়িক পড়ায় কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ খাতের বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
সাম্প্রতিক গোলযোগের এক চরমতম মুহূর্তে সাজেক ভ্রমণরত পর্যটকদের নিরাপত্তা ও উদ্ধার অভিযান নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর। তাদের প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বিবরণ অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক দশটার দিকে সাজেক সড়কের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং গাছপালা ফেলে ও ব্যারিকেড দিয়ে পর্যটকবাহী সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াতের পথ সুগম করতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আলোচনা চলাকালেই সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের উসকানিতে অবরোধকারীরা অতর্কিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও সহিংস রূপ নেয়, যখন বেলা ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডাররা অতর্কিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরপরাধ পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড সরাসরি গুলিবর্ষণ করে।
আকস্মিক এই প্রাণঘাতী হামলার মুখে সেনাবাহিনীর টহল দল নিজেদের আত্মরক্ষা এবং অবরুদ্ধ পর্যটকদের জীবন রক্ষার্থে পাল্টা সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ করে। সেনাবাহিনীর দ্রুত ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের ফলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের গহিন জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত কৌশলগত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে পড়া সমস্ত পর্যটককে অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে এই গোলাগুলির ঘটনায় অলৌকিকভাবে কোনো পর্যটক বা সেনা সদস্য হতাহত হননি। আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন অভিযান জোরদার করার কারণে সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের ক্যাডাররা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করতে তারা সাধারণ পর্যটন এলাকাগুলোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় জনমানুষের জীবন-জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যেও একই ধরনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের গাড়িবহর উদ্ধার করে নিরাপদে উজো বাজার এলাকা পার করে দেওয়ার সময় পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ঘণ্টাখানেক তীব্র গোলাগুলি চলে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে অবরুদ্ধ পর্যটকদের সাজেক থেকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। এ প্রসঙ্গে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান যে, সকালে উজো বাজার এলাকায় পর্যটকদের বহর আটকে দেওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। কিন্তু অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়ে এবং একপর্যায়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডাররা সরাসরি গুলি চালাতে শুরু করে। জবাবে সেনাবাহিনীও পাল্টা গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পাহাড়ের এই অস্থিরতার মধ্যেই আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। উজো বাজারের গোলাগুলির ঘটনার পর ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ‘ছাত্র-সংগ্রাম জনতার পরিষদ’ নামের একটি সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় নতুন করে আধাবেলা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের তথাকথিত সশস্ত্র ক্যাডারদের সাজেক ভ্যালি থেকে উচ্ছেদ করার তিন দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে ‘সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে এবং পর্যটকদের সাজেক ত্যাগ করার অনুরোধ জানায়। এই সংঘাতময় বাস্তবতায় সাধারণ পর্যটকদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবস্থানরত সমস্ত পর্যটককে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ জারি করে।
সাজেক কটেজ ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বাঘাইছড়ির এই পাহাড় চূড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টির মতো রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এদের কোনোটিতে পাঁচ থেকে সাতটি এবং কোনোটিতে বারো থেকে পনেরোটি পর্যন্ত উন্নতমানের কক্ষ রয়েছে। মূল পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটক এসব কটেজে রাতযাপন করেন। প্রতিবছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাসকে সাজেকের প্রধান ও লাভজনক পর্যটন মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। উদ্যোক্তাদের হিসাব মতে, কেবল এই তিন মাসের ভরা মৌসুমে কটেজ মালিকদের ঘর ভাড়া বাবদ ব্যবসা হয় প্রায় ২৭ কোটি টাকা। আগত পর্যটকরা খাওয়া-দাওয়া ও রেস্তোরাঁ খাতে ব্যয় করেন আরও ২২ কোটি টাকা এবং স্থানীয় চান্দের গাড়ি ভাড়া ও ঘোরাঘুরি বাবদ খরচ হয় প্রায় ২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে এই অঞ্চলে প্রায় পৌনে একশো কোটি টাকার এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়।
আসন্ন ভরা মৌসুমকে সামনে রেখে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা লাখ লাখ টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করেছিলেন। বর্ষার পর কটেজ ও রিসোর্টগুলো নতুন করে সংস্কার করা হয়েছিল, কক্ষের ভেতরের মানোন্নয়ন করা হয়েছিল এবং পর্যটকদের সুবিধার্থে অতিরিক্ত লজিস্টিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই গোলাগুলি ও সড়ক অবরোধের মতো সংঘাত সৃষ্টি হওয়ায় সেই কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। পর্যটন খাতের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, বছরের বারো মাস সমান ব্যবসা হয় না। ঈদ, পূজা, সরকারি দীর্ঘ ছুটি এবং মূলত শীতকালের তিন-চার মাসের আয় দিয়ে উদ্যোক্তারা বছরের বাকি অলস সময়গুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মিটিয়ে থাকেন। কিন্তু মূল মৌসুমেই যদি এমন অস্থিরতার কারণে রুম বুকিং বাতিল করতে হয় এবং গ্রাহকদের অগ্রিম টাকা ফেরত দিতে হয়, তবে পুরো খাতের ওপর দেউলিয়া হওয়ার মতো মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে।
সাজেকে নিজস্ব কটেজ ও রিসোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং কটেজ ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মো. যুবরাজ বর্তমান করুণ পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান যে, সাজেক এখন সম্পূর্ণ পর্যটকশূন্য এক ভৌতিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। সংঘাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তিনি একাই প্রায় এক লাখ টাকার অগ্রিম রুম বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি জানান, অন্য সব ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের অবস্থাও হুবহু একই রকম। এই সংকট সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হলেও এ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ফল মেলেনি। ফলে এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পর্যটন খাতের সমুদয় বিনিয়োগ পুরোপুরি পণ্ড হয়ে যাবে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত হলো, সাজেকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড টিকিয়ে রাখতে হলে অনতিবিলম্বে পাহাড়ে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় বিরোধগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমাধান খুঁজতে হবে। সাজেকে কেবল কটেজের অবকাঠামো নির্মাণ করলেই ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব শেষ হয় না; পর্যটক না থাকলেও প্রতি মাসে স্টাফদের নির্ধারিত বেতন, চড়া বিদ্যুতের বিল এবং নিয়মিত মোট পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়। পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে গেলে এই পরিচালন ব্যয় মেটানো এক অসম্ভব ব্যাধি হয়ে দাঁড়ায়। সাজেকের নীল আকাশ ও মেঘের অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের মূল আকর্ষণ হলেও, নিরাপদ যাতায়াত এবং শান্তিশৃঙ্খলা ছাড়া কোনো পর্যটন শিল্পই টিকে থাকতে পারে না।
একই অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মো. ফয়সাল গভীর হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, এর আগেও টানা চারদিন পাহাড় বন্ধ থাকার পর দুর্গা পূজার ছুটিতে সাজেক পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে সবার হাতেই প্রচুর শুভ বুকিং ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে চরম সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তাঁদের এখন পকেটের টাকা খরচ করে পর্যটকদের অগ্রিম জমানো টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। নতুন করে কটেজ সাজানো ও ডেকোরেশনের পেছনে যে বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন যদি অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সাজেক সড়কের স্থায়ী নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তবে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা