• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ন

পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী রুখতে সেনা অভিযান জোরদার

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পাহাড়ভিত্তিক সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর নাশকতামূলক তৎপরতা রুখে দিতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত ২৪শে জুন থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক ও সমন্বিত সামরিক অভিযান বর্তমানে পাহাড়ের অত্যন্ত দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জোরদার করা হয়েছে। এই বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে অতি সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার বান্দরবানের দুর্গম রেত্লাং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী একটি বড় ধরনের সফল অপারেশন পরিচালনা করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে হঠাৎ করে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে নানামুখী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইন্ধন কাজ করছে। মূলত দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে এবং পাহাড়ে নতুন করে অশান্তি ছড়াতে একটি বিশেষ মহল পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন সম্পূর্ণ মারমুখী অবস্থানে রয়েছে এবং এই সাঁড়াশি অভিযান অনির্দিষ্টকালের জন্য চলমান থাকবে।

গত বৃহস্পতিবার বান্দরবান অঞ্চলের অত্যন্ত প্রত্যন্ত ও দুর্গম রেত্লাং এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) এবং ইউপিডিএফ (মূল)-এর একটি যৌথ গোপন আস্তানার সুনির্দিষ্ট তথ্য পায় নিরাপত্তা বাহিনী। এই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী সেখানে একটি বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে আস্তানায় লুকিয়ে থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ বা ‘গানফাইট’ সংঘটিত হয়। একপর্যায়ে টিকতে না পেরে সশস্ত্র লড়াকুরা গভীর জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। বর্তমানে ওই আস্তানা এবং তার আশপাশের বিশাল পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর তল্লাশি ও কম্বিং অপারেশন অব্যাহত রয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিশেষ বার্তায় জানিয়েছে যে, চলমান অভিযানের কৌশলগত ও নিরাপত্তা জনিত কারণে এই অপারেশনের বিস্তারিত তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সাথে পাহাড়ের সংবেদনশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ জনগণকে যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর আগে গত এক সপ্তাহের সামরিক অভিযানে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। গত ২৪শে জুন খাগড়াছড়ির পানছড়ি এবং রামগড় উপজেলায় পৃথক দুটি সফল অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে পানছড়ির লটাকলক এলাকায় অভিযান পরিচালনাকালে সেনাবাহিনীর ধাওয়ায় টিকতে না পেরে ইউপিডিএফ-এর দুই সশস্ত্র সদস্য দুটি অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ১৩২ রাউন্ড তাজা গুলিসহ যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। একই দিনে রামগড়ের হাজাছড়া এলাকায় অন্য একটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিহত হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে আরও একটি একে-৪৭ রাইফেল, একটি ম্যাগাজিন, একটি ওয়ান শুটার বা পাইপ গান এবং ২৭ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। একের পর এক ভারী অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র সদস্যদের এই আত্মমর্পণ প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে সামরিক বাহিনীর তীব্র চাপের মুখে পাহাড়ের আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখন বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে হঠাৎ করে সেনাবাহিনীর এই ব্যাপক তৎপরতা ও সাঁড়াশি অভিযানের পেছনে রয়েছে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের এক নিখুঁত সমন্বয়। গত ২২শে জুন দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় গণমাধ্যমে “ইউপিডিএফের পুনরুত্থান: পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে অশান্তির আশঙ্কা” শিরোনামে একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে তথ্য-প্রমাণসহ উন্মোচন করা হয় যে, পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারে ইউপিডিএফ (মূল) দল পুনর্গঠন করার পাশাপাশি সীমান্তে নতুন সদস্য সংগ্রহ, ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট এবং মিয়ানমার ও ভারতের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় ভারী অস্ত্রের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ জোরালোভাবে শুরু করেছে। এই সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই প্রশাসনের নীতিগত মহলে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পাহাড়ের শান্ত পরিবেশ যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সেজন্যই মূলত ২৪শে জুন থেকে তিন পার্বত্য জেলায় এই সমন্বিত ক্রাশ প্রোগ্রাম বা সাঁড়াশি অভিযান শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

স্থানীয় বাসিন্দা এবং পার্বত্য আঞ্চলিক রাজনীতির খবরাখবর রাখা বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর মতে, গত জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণেও বড় ধরনের ওলটপালট হয়েছে। এই সুযোগে ইউপিডিএফ দীর্ঘদিন পর খাগড়াছড়ির বাইরেও বেশ কিছু নতুন গ্রাম ও দুর্গম জনপদে নিজেদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও চাঁদাবাজির পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তার করতে শুরু করে। এমনকি বান্দরবানের কিছু এলাকাতেও তাদের গোপন ক্যাম্পের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাঙামাটি জেলাটি এখনও প্রবীণ পাহাড়ি নেতা জ্যোতিবিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)-র নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) মূল ঘাঁটি বা শক্ত অবস্থান হিসেবেই রয়ে গেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষ নেতারা বর্তমানে দেশের বাইরে বা ইউরোপ-আমেরিকায় অবস্থান করলেও, তারা নিয়মিত স্যাটেলাইট ফোন এবং বিভিন্ন গোপন ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক অপারেশন এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ চাঁদার টাকা সংগ্রহ ও তদারকি করছেন।

পাহাড়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদের এই অবৈধ মজুতদারির পেছনের চিত্রটি আরও বেশি ভয়ংকর এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে গভীর উদ্বেগের। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক বিশেষ মূল্যায়নে জানা যায়, ভারতের মিজোরাম রাজ্য হয়ে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক অবৈধ অস্ত্রের চালান মিয়ানমারের চিন রাজ্যে প্রবেশ করার কথা ছিল। সেখান থেকে সেই অত্যাধুনিক অস্ত্রের চালান আরাকান আর্মির সদর দফতর পালেতভা কিংবা লাইজা হয়ে উত্তর রাখাইনের বুথিডংয়ে পৌঁছানোর পথ তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক এই চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল, রাখাইনের সংঘাতের সুযোগ নিয়ে সেই বিশাল অস্ত্রের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের অরক্ষিত ও দুর্গম সীমান্ত দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জেলাগুলোতে পাচার করা, যাতে এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে ভারী অস্ত্র তুলে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সংকটে ফেলা যায়।

বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক এই ষড়যন্ত্র এবং পাহাড়ের নতুন সশস্ত্র পুনরুত্থানকে অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অভিযানে সরকার একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড স্ট্র্যাটেজি’ বা সমন্বিত কৌশল অবলম্বন করছে, যেখানে মাঠপর্যায়ের সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সীমান্তের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা নজরদারিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত সব জাতিসত্তা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের টেকসই উন্নয়ন, স্থায়ী শান্তি এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের কঠোর ও আপসহীন অভিযানের কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়কে কোনোভাবেই দেশী-বিদেশী লুণ্ঠনকারী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না—সেনাবাহিনীর এই দৃঢ় অবস্থান দেশের সার্বিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category