জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং চলমান জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বা সিপিডির এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায়। রাজধানীর মহাখালীতে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্রকলগুলোর অব্যবহৃত ছাদগুলোকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই প্রায় এক হাজার সাতশো আটষট্টি মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। বর্তমান সময়ে যখন গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতিতে শিল্প কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে কারখানার বিশাল ছাদগুলোকে সোলার প্যানেলের আওতায় নিয়ে আসার এই উদ্যোগ দেশের পুরো জ্বালানি খাতের জন্য একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও পথনির্দেশক বার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সিপিডির গবেষণালব্ধ তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট তিন হাজার তিনশো কুড়িটি পোশাক কারখানার ভৌত অবকাঠামো এবং ছাদের আয়তন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সরাসরি তিনশো পঞ্চাশটি কারখানার ওপর বিস্তারিত সমীক্ষা চালানো হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আওতায় থাকা কারখানাগুলোর ছাদের মোট আয়তন প্রায় নিরানব্বই লাখ বর্গমিটারের কাছাকাছি। যদি এই পুরো জায়গাকে সঠিকভাবে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়, তবে তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তৈরি পোশাক খাতের সামগ্রিক চাহিদার প্রায় চৌদ্দ শতাংশ পর্যন্ত সফলভাবে মিটিয়ে ফেলতে পারবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এভাবে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ মাত্র তিন টাকা চার পয়সা থেকে শুরু করে বড়জোর চার থেকে পাঁচ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, যা জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহকৃত প্রচলিত বিদ্যুতের মূল্যের প্রায় অর্ধেকে বা তার চেয়েও কমে নেমে আসবে।
তবে এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় বারো হাজার ছয়শো উনসত্তর কোটি টাকা বা এক দশমিক শূন্য তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিশাল অংকের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মত প্রকাশ করেছেন যে, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদের হার যদি সাড়ে দশ শতাংশের বেশি হয়, তবে উদ্যোক্তারা এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। তাই সাশ্রয়ী বা রেয়াতি সুদে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় শতাংশের কাছাকাছি হারে সবুজ অর্থায়ন বা গ্রিন ফাইন্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য সর্বাগ্রে জরুরি। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের মধ্য দিয়ে টিকে আছে, অথচ অনেক আগেই যদি রুফটপ সোলারের ওপর জোর দেওয়া যেত তবে আজকের এই ভয়াবহ জ্বালানি খরা দেখতে হতো না।
বর্তমানে সব কারখানা এককভাবে একযোগে এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো অবস্থানে না থাকলেও, প্রায় পাঁচশটি কারখানা এখনই নিজ উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আরও প্রায় তেরোশো কারখানাকে যদি সামান্য নীতিগত সহায়তা ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া যায়, তবে তারাও খুব দ্রুত এই সবুজ প্রযুক্তির আওতায় চলে আসতে পারবে। বিশ্ববাজারে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট কিংবা গ্যাপের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য ক্রয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কেবল জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ডিকার্বনাইজেশন বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর এই বৈশ্বিক শর্ত পূরণ করা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এখন টিকে থাকার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ধারণার বাস্তব উদাহরণ টেনে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের নিজস্ব কারখানায় ইতোমধ্যে প্রায় ঊনত্রিশ দশমিক দুই মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে, যা তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার পনেরো শতাংশ এবং সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ছয় শতাংশ মেটাচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীনের আধুনিক প্রযুক্তি, আর্থিক সহযোগিতা এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতি এবং বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন যে, যদি সঠিক নীতিমালা, কম সুদে ঋণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তবে কারখানার ছাদ থেকেই দেশের শিল্প খাতের শক্তির একটি বড় অংশের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।