• সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ন

প্রতিদিনই কেন থমকে যায় ঢাকা

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কর্মব্যস্ত রাজধানী ঢাকা যেন প্রতিদিন সকালেই নতুন কোনো কারণে থমকে যাচ্ছে| যানজট নগরবাসীর কাছে দীর্ঘদিনের এক পরিচিত দুঃস্বপ্ন হলেও, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পরিস্থিতি রীতিমতো এক স্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে| ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে নষ্ট হচ্ছে লাখো মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা, আর চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অফিসগামী মানুষ, পরীক্ষার্থী এবং অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহনগুলো| তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন থেকে যানজটের এক ভিন্ন ও চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে| প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর সড়কগুলোতে এই স্থবিরতার মূল কারণ কেবল যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ বা দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নয়; বরং নাগরিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি, জলাবদ্ধতা এবং সড়ক দখলে রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনই এই যানজটের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে|
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জুলাই ও আগস্ট মাসের যানজটের কারণগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে দুটি পৃথক প্রতিবেদন তৈরি করেছে| জুলাই মাসের ওই অভ্যন্তরীণ নথিতে রাজধানীতে তীব্র যানজট সৃষ্টির ২১টি সুনির্দিষ্ট ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে| অত্যন্ত বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই ২১টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৬টি যানজটই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা পরিবহন চালকদের সড়ক অবরোধের কারণে| বাকি পাঁচটি ঘটনা ছিল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সড়ক দেবে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট, আর কেবল একটি ঘটনায় পুলিশ নিরাপত্তাজনিত কারণে রাস্তা বন্ধ রেখেছিল|
প্রতিবেদনে যানজটের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দাবি আদায়ের সহজতম পথ হিসেবে রাজপথকে ব্যবহার করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে| যেমন, ১৪ ও ১৫ জুলাই কেবল দুই দিনেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির কারণে বিএনএস টাওয়ার, সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগ ও গুলশানের মতো অন্তত নয়টি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়| এর বাইরে ১২ জুলাই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে চাকরিপ্রার্থীরা ইউবিএল ক্রসিংয়ে, ৪ জুলাই মিরপুরে শিশু ধর্ষণের বিচার চেয়ে স্থানীয় জনতা এবং ৫ জুলাই অটোরিকশা ডাম্পিংয়ের প্রতিবাদে চালকরা সড়ক বন্ধ করে দেন| এমনকি ২২ জুলাই গ্যাসের তীব্র সংকটের প্রতিবাদে সিএনজি চালকরাও লা মেরিডিয়ানের সামনের রাস্তা অবরোধ করে রাখেন| ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, “দাবি আদায়ে রাস্তা বন্ধ করা হয়তো দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণের একটা কৌশল হতে পারে, কিন্তু একটি মোড় বন্ধ হলে তার চেইন রিঅ্যাকশনে পুরো এলাকার যান চলাচল থমকে যায়, যার মূল্য দিতে হয় সাধারণ নাগরিকদের|”
আগস্ট মাসের যানজটের চিত্রও ছিল প্রায় অভিন্ন| ট্রাফিক বিভাগের আগস্টের প্রতিবেদনে যানজট সৃষ্টির ২০টি ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে, যার প্রায় সবই ছিল রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মসূচি কেন্দ্রিক| ৬ আগস্ট মুক্তাঙ্গনে ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে লোকসমাগমের কারণে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট অচল হয়ে যায়| ৮ আগস্ট সরকারি দলের অনুষ্ঠানের জন্য যাত্রাবাড়ীতে মঞ্চ তৈরি, ৯ আগস্ট শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে উত্তরায় সড়ক অবরোধ, ১২ আগস্ট যুব দিবসের র‍্যালির কারণে প্রেস ক্লাব ও কাকরাইলে যানজট এবং ১৪ আগস্ট জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যাত্রাবাড়ীতে মঞ্চ তৈরির কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়| একই দিনে মিরপুরে সুপেয় পানির দাবিতে বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দারাও সড়ক অবরোধ করেন|
রাজনৈতিক ও নাগরিক ক্ষোভের পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নমূলক কাজও যানজটকে তীব্রতর করে তুলছে| ডিএমপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাইয়ের ১২ তারিখে ভারী বৃষ্টিতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারওয়ান বাজার অংশের নিচসহ বনানী, খিলক্ষেত ও ঢাকা গেট এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়| একই দিনে অতিবৃষ্টিতে নারিন্দা ক্রসিংয়ে সড়কের চার-পাঁচ ফুট অংশ দেবে গেলে বড় যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়| এছাড়া রামপুরা-বাড্ডা সড়কে ওয়াসা ও মেট্রোরেলের সমন্বয়হীন কাজ, ফ্লাইওভারের নিচে সংকুচিত লেন এবং নিমতলীর মতো পয়েন্টে ভুল ট্রাফিক নকশার কারণে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে|
যানজট পরিস্থিতির অবনতির পেছনে উন্নয়ন বাজেটের অর্থায়নে বিলম্বকে অন্যতম বড় একটি কারণ বলে মনে করেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান| তিনি বলেন, “সরকারি উন্নয়নকাজে সময়মতো অর্থ না পাওয়ায় বছরের শেষ দিকে এসে বিশেষ করে জুন মাসে সব কাজ একসঙ্গে করার তাগিদ তৈরি হয়, যার ফলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে তীব্র জট বাড়ে|” তিনি আরও যুক্ত করেন যে, গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে সমাবেশ বা মিছিল করার অধিকার সবার থাকলেও, সেটি সাধারণ যান চলাচলের রাস্তার ওপর না করে পূর্বাচলের মতো বড় উন্মুক্ত স্থানে করার জন্য একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি|
ক্রমবর্ধমান এই যানজট পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিএমপি এখন প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছে| আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার পর এবার রাজধানীতে যানজট নিয়ন্ত্রণে ‘ড্রোন সার্ভিল্যান্স’ বা ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালুর যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে| পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে একটি ড্রোনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফ্লাইওভার এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের রিয়েল টাইম তথ্য সংগ্রহ করা হবে| ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, এই ড্রোনে ভয়েস বা শব্দের ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে আইন ভঙ্গকারী বা যানজট সৃষ্টিকারী যানবাহনকে ওপর থেকেই সতর্কবার্তা দেওয়া যাবে| এছাড়া ভবিষ্যতে ড্রোনের সাথে অটোমেটেড নম্বর প্লেট রিডার (এএনপিআর) প্রযুক্তি যুক্ত করে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে সরাসরি ট্রাফিক মামলা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে পুলিশের|
ডিএমপির এই বিশদ বিশ্লেষণ একটি বিষয়কে অত্যন্ত সুস্পষ্ট করে তুলেছে যে, ঢাকার যানজট এখন আর কেবল একটি সাধারণ ট্রাফিক বা পরিবহন ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়| বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যেখানে প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাগরিক সমস্যা সমাধানে বিলম্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছু মিলেই পুরো নগরজীবনকে প্রতিদিন এক দমবন্ধ করা স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে|
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category