• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যা: দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ইবোলার টিকা আসতে ৯ মাস লাগতে পারে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে চাঁদা দাবির জেরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩

প্রশাসনে নিয়োগ ও বদলিতে অস্থিরতা: বাড়ছে চরম বিশৃঙ্খলা

সমকাল | দেলওয়ার হোসেন / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সুশাসনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো একটি সুশৃঙ্খল ও গতিশীল জনপ্রশাসন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে বদলি, পদায়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি হয়েছে, যা সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝেও চরম হতাশা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ যাচাই-বাছাই ছাড়া তাড়াহুড়ো করে প্রজ্ঞাপন জারি এবং পরবর্তীতে বিতর্কের মুখে তা বাতিলের মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সরকারের সচিব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর ও সংস্থার শীর্ষ প্রধান থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের পুলিশ সুপারসহ (এসপি) অন্তত ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিয়োগ বা বদলির আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং ঘন ঘন আদেশ পরিবর্তনের ফলে সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি কর্মকর্তাদের মাঝে বিভাজন, দলাদলি ও আস্থাহীনতার মাত্রাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যাচাই-বাছাইয়ে ত্রুটি ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব

বর্তমান জনপ্রশাসনের এই তালগোল পাকানো অবস্থার পেছনের মূল কারণ হিসেবে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের আগে তার পেশাগত দক্ষতা, অতীত কর্মময় জীবনের রেকর্ড, সততা এবং তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিভাগীয় বা আইনি তদন্ত চলমান আছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার কথা। কিন্তু বর্তমানে এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে।

আরেকটি অভাবনীয় প্রবণতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। একটি প্রজ্ঞাপন জারির পর যখনই নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর তরফ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়, তখনই সরকার কোনো ধরনের কার্যকর নিজস্ব তদন্ত ছাড়াই চাপের মুখে নিয়োগ বাতিলের পথে হাঁটছে। এর ফলে অনেক সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাও যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই জনমনে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

নিয়োগ ও প্রত্যাহারের চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও তা বাতিলের ঘটনা প্রশাসনে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী পদ: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী পদে গত ২৪ মার্চ এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান আবদুর রশীদ মিয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিয়োগের মাত্র পাঁচ দিন পরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি যখন এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমনকি ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, দুদকের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার তদন্তাধীন থাকা একজন ব্যক্তিকে কীভাবে এত বড় একটি পদের জন্য প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ করা হলো?

  • ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক: দেশের কৃষি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক পদে রদবদল নিয়েও চরম নাটকীয়তা দেখা গেছে। গত ৩ মে প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই আদেশের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। দুদিনের মাথায় কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়।

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে রেকর্ড: সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে সেই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতো এত উচ্চ পর্যায়ের পদে নিয়োগ এবং তা দুই ঘণ্টার মধ্যে বাতিলের ঘটনা দেশের ইতিহাসে বিরল।

  • পুলিশ সুপার (এসপি) পদে রদবদল ও প্রত্যাহার: মাঠ প্রশাসনের অত্যন্ত সংবেদনশীল পদ হলো জেলা পুলিশ সুপার বা এসপি। গত ৫ মে সারা দেশের ১২টি জেলার এসপি পদে বড় ধরনের রদবদল এনে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু এই নিয়োগের পরপরই বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হলে তাদের মধ্য থেকে তিনজনকে আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। গত ৯ মে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি আদেশে ফেনীর এসপি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান এবং পঞ্চগড়ের এসপি মো. মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। এর ঠিক ১০ দিনের মাথায় মৌলভীবাজারের এসপি মো. রিয়াজুল ইসলামকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি আদেশে এসব প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা না হলেও, জানা যায় যে সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার কারণেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

  • সচিব পর্যায়ে রদবদল ও স্থগিতাদেশ: প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর সচিবদের বদলি নিয়েও একই ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা গেছে। গত ২৫ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত বা ওএসডি করা হয়। ওই দিনই তাদের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে অন্য তিনজন সচিবকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আগের তিন সচিবের বদলির আদেশ আকস্মিকভাবে স্থগিত করে নতুন নিয়োগ পাওয়া তিন সচিবের আদেশ পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

  • সকালে পদোন্নতি, বিকেলে বাতিল: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানেও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার চিত্র প্রকট। গত সোমবার সকালে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মিজানুর রশীদকে পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী পরিচালক (ইডি) করা হয়। কিন্তু বিকেল গড়াতে না গড়াতেই সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে।

  • শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস নিয়োগ ও সামাজিক মাধ্যমের ঝড়: গত ১০ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। কিন্তু এই নিয়োগের পরপরই কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে তার অতীত নিয়ে সরব হন। তারা প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন যে, ওই কর্মকর্তা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মতাদর্শ নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লেখালেখি করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রবল সমালোচনার মুখে গত ১৪ মে তার এপিএস পদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই দিনে তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তার পদ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে পুনরায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় অব্যাহত থাকায় অবশেষে গত মঙ্গলবার তার এই দ্বিতীয় নিয়োগাদেশটিও বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার।

বদলি আদেশের প্রতি চরম অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্য

প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ অমান্য করার প্রকাশ্য ধৃষ্টতা। সরকার একটি সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করার পরও কর্মকর্তারা মাসের পর মাস তা তোয়াক্কা করছেন না।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুলের ৮১ নম্বর ধারায় বদলি ও যোগদানের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির জন্য একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ছয় দিন সময় পেতে পারেন (যাতায়াতের সময় ব্যতীত)। আর বদলি হওয়া কর্মস্থল যদি একই শহরের ভেতরে হয়, তবে প্রস্তুতির জন্য কোনো অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে না; অর্থাৎ আদেশের পরপরই তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। কিন্তু এই নিয়মের কোনো প্রয়োগ এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

গত ২৬ এপ্রিল সরকার পরিবেশ ও খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ), জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলসহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনে। এসব পদে নিয়োগ পাওয়া সবাই অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই ১৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত সাতজন প্রায় এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। এর ফলে ওই শূন্য পদগুলোর কারণে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলোর প্রাত্যহিক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বদলি আদেশের পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া এই কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছেন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়া দিল আফরোজা (বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব)। এছাড়া পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান (বর্তমানে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক)। যোগ না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, “বর্তমান কর্তৃপক্ষ এখনও আমাকে রিলিজ করেনি, তাই নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারিনি।”

একইভাবে, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়া খোন্দকার আনোয়ার হোসেন (বর্তমানে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পরিচালক) দম্ভের সাথে জানান যে, “বর্তমান দপ্তরের কাজ এখনও শেষ হয়নি, তাই যোগদান করিনি। শিগগিরই যোগ দেব, তবে তারিখ বলতে পারছি না।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রাজা মো. আবদুল হাইকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এনটিআরসিএ-এর চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। কিন্তু এনটিআরসিএর সাধারণ কর্মকর্তারা হতাশা প্রকাশ করে জানান, তিনি গত ৫ মে শুধু অফিসে এসে সবার সাথে পরিচিত হয়ে গেছেন, এরপর আর একদিনের জন্যও দপ্তরে আসেননি।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “আমার হাতে আরও একটি প্রকল্পের দায়িত্ব রয়েছে। তাই ডিজি স্যার বলেছেন ১ জুনের দিকে আমাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।” বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়া মো. শফিকুল ইসলাম এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেল পদে নিয়োগ পাওয়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসান মাহমুদও এখন পর্যন্ত তাদের নতুন কর্মস্থলে পা রাখেননি। হাসান মাহমুদের ভাষ্য, “যোগদান না করার কোনো কারণ নেই, তবে আরও কিছুদিন পরে যাব।”

এই ধরনের মানসিকতা প্রমাণ করে যে প্রশাসনের ওপর সরকারের শীর্ষ মহলের চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। শুধু অতিরিক্ত সচিব নন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উপসচিব এবং যুগ্ম সচিবদের বিরুদ্ধেও বদলির এই ধরনের সরকারি নির্দেশনা দিনের পর দিন না মানার অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ছে।

পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বস্তিকর ছায়া

প্রশাসনে এ ধরনের অস্থিরতা একেবারে নতুন নয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও প্রশাসনে এমনই এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবালয়ের ভেতরেই নজিরবিহীন আন্দোলনে নেমেছিলেন। সচিব ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সরাসরি বিক্ষোভ করেছিলেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। সেই প্রবল আন্দোলনের মুখে পড়ে প্রজ্ঞাপন জারির পরও দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগেই অন্তত আটজন ডিসির পদায়ন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন সরকার।

একইভাবে, নিয়োগ পাওয়ার পরপরই অন্তত সাতজন সচিবের পদায়ন বাতিল করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এমনকি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ছয়জন সদস্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা, অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠায় মাত্র ১১ দিনের মাথায় তাদের সবার নিয়োগাদেশ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা সামাল দিতে চারজন উপদেষ্টা এবং দুজন জ্যেষ্ঠ সচিবের সমন্বয়ে একটি ‘জনপ্রশাসনবিষয়ক কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির মূল কাজ ছিল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে সরকারকে বস্তুনিষ্ঠ পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু সেই কমিটিও তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনতে ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতামত ও করণীয়

প্রশাসনের এই নড়বড়ে অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তাকে পদায়নের ক্ষেত্রে কারও ব্যক্তিগত মতামত নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই ঠিকই, কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার স্বার্থে ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি ও যাচাই-বাছাই অপরিহার্য।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, “বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়াটা এক ধরনের প্রচলিত রীতি। বিশেষ করে যুগ্ম সচিব বা তার ওপরের পদে বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। এরপর প্রধানমন্ত্রী সব দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।”

অন্যদিকে, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার তার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমি যখন উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী তার পছন্দের এক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য লিখিত ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা যখন ওই কর্মকর্তার অতীত বিষয়ে গভীর যাচাই-বাছাই করি, তখন বেশ কিছু মারাত্মক নেতিবাচক তথ্য আমাদের হাতে আসে। এরপর আমরা বিষয়টি সদয় অবগতির জন্য মন্ত্রী মহোদয়কে জানাই এবং ওই নিয়োগ আটকে দিই।”

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিয়োগে পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার জন্য বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এবং অতিরিক্ত সচিবদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাই সেল থাকা জরুরি। তারা প্রতিটি প্রার্থীর পেশাগত ও ব্যক্তিগত রেকর্ড নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবেন। একবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রজ্ঞাপন জারির পর কোনো অযৌক্তিক বা বাহ্যিক চাপে তা পরিবর্তন করা থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় জনপ্রশাসনের এই বিশৃঙ্খলা অচিরেই গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতাকে স্থবির করে দেবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category