• সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাবে ধুঁকছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

যেকোনো রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের মূলভিত্তি হলো একটি সুগঠিত ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং কঠোর নজরদারির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে। অথচ বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও গত প্রায় দেড় দশক ধরে দেশের সমগ্র শিক্ষাঙ্গনে সুশাসনের চরম ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা—প্রতিটি স্তরেই যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, ব্যাপক দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং নজরদারির চরম অনুপস্থিতি শিক্ষার গুণগত মানকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দেশে শিক্ষার্থীর ভর্তির হার হয়তো বেড়েছে, কিন্তু পদ্ধতিগত ত্রুটি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে শিক্ষার প্রকৃত মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষার দিকে তাকালে এক ভয়াবহ নেতৃত্বহীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ৪৫৭টি প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি পদই সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে আছে। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি (৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এই বিপুল শূন্যতার বিপরীতে সম্প্রতি মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, যা মহাসাগরে এক বিন্দু জলের সমতুল্য। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, অভিভাবকহীন এসব বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মাহমুদা হাবিবা অবশ্য এই সংকটের পেছনে আইনি জটিলতাকে দায়ী করেছেন। তার মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৮৩ হাজারের বেশি মামলা চলমান থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খাচ্ছে, তবে সংকট উত্তরণে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।

नेतৃত্বহীনতার এই প্রভাব সরাসরি পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিখন ফলের ওপর। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগের তুলনায় শিক্ষার্থীদের মেধা ও দক্ষতার সূচক বেশ নিম্নমুখী। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ব্যয় হওয়ার পরও ২০২২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৩৯ শতাংশ গণিতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। অথচ ২০১১ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৬৭ ও ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও গত এক যুগে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলার দক্ষতা ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং গণিতের দক্ষতা ১১ পয়েন্ট কমে গেছে।

প্রাথমিকের এই রুগ্‌ণ দশা মাধ্যমিক স্তরে এসে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশে বর্তমানে ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলেও প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে মাত্র ৫৭২টি। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ৫৭২টি পদের মধ্যে ৩৭৯টি পদই শূন্য, যা মোট পদের ৬৬ শতাংশ। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে শূন্যতার হার আরও ভয়াবহ, প্রায় ৭৫ শতাংশ পদ ফাঁকা পড়ে আছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই নয়, বাইরে থেকে যারা এই বিদ্যালয়গুলো তদারকি করবেন, সেই পদগুলোতেও বিরাজ করছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্যমতে, বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং সহকারী পরিদর্শকের শতভাগ পদই বর্তমানে শূন্য। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদেও অর্ধেকের বেশি চেয়ার খালি পড়ে আছে।

তদারকি ও নজরদারির এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে বাসা বেঁধেছে দুর্নীতির বিশাল সিন্ডিকেট। বিগত সরকারের আমলে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মতো একটি মহৎ উদ্যোগেও নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় এনসিটিবির কর্মকর্তা ও ৫০টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। নজরদারির অভাবে খোদ রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে মেরামত, ম্যাগাজিন ফি এবং একাডেমিক উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। তদারকিহীন এই ব্যবস্থার মাশুল গুনতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স বলছে, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী দশ বছরের শিক্ষাজীবন শেষে প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শ্রেণির সমমানের দক্ষতা অর্জন করছে। এমনকি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ)।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সুশাসনের এই আকাল একইভাবে দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ নেতৃত্ব ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, ৮৯টিতে উপ-উপাচার্য এবং ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কোষাধ্যক্ষ নেই। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গত দেড় দশকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও আর্থিক লেনদেনই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় উঠে এসেছে যে, শিক্ষক নিয়োগে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও শর্ত শিথিল করে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের নজির রয়েছে, যেখানে প্রার্থীর ন্যূনতম সিজিপিএ না থাকা সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চরম অস্বচ্ছতার বিষয়টি তুলে ধরেছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। তাদের মতে, দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিক হিসাবমান মেনে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী তৈরি করছে না। এতে করে রাষ্ট্রীয় তহবিলের কোটি কোটি টাকার কোনো সঠিক জবাবদিহিতা থাকছে না। পাশাপাশি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির কারণে আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, শিক্ষক নিয়োগে নগ্ন রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণেই পেশাদারিত্বের এই চরম অবক্ষয় ঘটেছে। তবে বর্তমান সরকারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জবাবদিহিতা ও মানসম্মত গবেষণার পথ উন্মুক্ত করবে বলে তিনি আশাবাদী।

শিক্ষাব্যবস্থার এই ত্রাহি অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, নতুন নতুন চমকপ্রদ প্রকল্পের পেছনে না ছুটে আগে বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে কার্যকর করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা আইনি মামলার অজুহাত দিয়ে দশকের পর দশক প্রধান শিক্ষক বা পরিদর্শকের পদ শূন্য রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ঢাকায় নতুন সচিব পদ সৃষ্টি করা গেলে জেলা পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তার পদ কেন পূরণ করা যাবে না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। এটি মূলত সদিচ্ছা ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের চরম অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীও মনে করেন যে, শিক্ষা প্রশাসনে নিয়োগ বাণিজ্য ও ভর্তি বাণিজ্য চিরতরে বন্ধ না করলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব নয়।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সংস্কার একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং শিক্ষা কমিশন গঠনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বীথিকা বিনতে হোসাইন জানিয়েছেন যে, বিগত ১৫ বছরে পরিকল্পিতভাবে অটোপাস ও ঢালাও জিপিএ-৫ দেওয়ার মাধ্যমে পুরো জাতিকে মেধাশূন্য করার যে চক্রান্ত হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার এখন বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে এগোচ্ছে। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের ভিত মজবুত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন জাতি গঠন করতে হলে সবার আগে শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি স্তরে নিশ্ছিদ্র সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category