ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে উঠতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নতুন নির্বাচিত সরকার। উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা ‘মব’ (Mob) মোকাবিলায় পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে এবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর দাঙ্গা দমন কৌশলের আদলে গড়ে তোলা হবে পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলোকে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুলিশের দুর্ধর্ষ দুই ইউনিট—অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-কে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে দক্ষ এই সদস্যরাই এখন দাঙ্গা পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা এবং ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জানমাল রক্ষার কৌশল রপ্ত করবেন। মূলত প্রচলিত তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিনির্ভর কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়াই এর লক্ষ্য।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২০ মাসে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি ও ভীতি কাজ করছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে কোন পর্যায়ে কী মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করতে হবে—তা নিয়ে অনেক সদস্যই এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এই মানসিক চাপ কাটিয়ে আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে কার্যকর বলপ্রয়োগ নিশ্চিত করতে চায় সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, “আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও সক্ষমতা বাড়াতে ইতিমধ্যে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের কাছে কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এসব দেশ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ এবং ‘মব’ মোকাবিলার আধুনিক কৌশল শিখিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, লাঠিপেটা বা গুলি চালানোর অনুমতি থাকলেও কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। নতুন প্রশিক্ষণে এই ঘাটতি পূরণে জোর দেওয়া হবে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীগুলোর মব হামলার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে খোদ পুলিশের সামনেই হামলা চালানো হয়েছে এবং পুলিশ সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন। সেনাবাহিনী মোতায়েন করেও এই প্রবণতায় বড় পরিবর্তন আসেনি। বর্তমান আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “পুলিশকে আরও সক্রিয়, জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা হচ্ছে যাতে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ হয়।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পুলিশের ওপর মানুষের নিরাপত্তা নির্ভর করে। তাঁরা যদি হামলার শিকার হন, তবে জনআস্থা কমে যায়। ২০২৩ সালের পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রতিবেদনেও কনস্টেবল পর্যায়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল, যা এখন বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষণের সময়সীমা বাড়িয়ে এক বছর প্রাতিষ্ঠানিক এবং দুই বছর মাঠভিত্তিক করার যে সুপারিশ ঝুলে ছিল, সরকার তা পুনর্মূল্যায়ন করছে।