• মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ন

বঙ্গোপসাগরে দুই এশীয় পরাশক্তির করিডোর যুদ্ধ

Reporter Name / ৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক রাজনীতিতে বর্তমানে এক উত্তপ্ত ও নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বঙ্গোপসাগর। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এখন এই অঞ্চলের জলসীমাকে কেন্দ্র করে দ্রুত আবর্তিত হচ্ছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং পরাশক্তিগুলোর বিশেষ প্রতিনিধিদের সফর বাংলাদেশের টেবিলকে এক বিশাল ও জটিল ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে রূপান্তর করেছে। একদিকে রয়েছে বেইজিং, যারা এই বছরের জুনের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের সামনে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও কৌশলগত ট্রাম্প কার্ড ‘সিএমবিসি’ বা চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেছে। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হলো চীনের কুনমিং প্রদেশ থেকে শুরু করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হয়ে সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা। ঠিক এর তিন সপ্তাহ পর জুলাইয়ের শুরুতে ঢাকায় পা রাখেন জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার শীর্ষ প্রধান ডক্টর তানাকা আকিহিকো, যার মূল বার্তা ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে বঙ্গোপসাগরে জাপানের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘বিগবি’ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ কোনোভাবেই ধীরগতির করা যাবে না।

বিলিয়ন ডলারের এই তীব্র করিডোর কূটনীতির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢাকা এখন এক বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়েছে। বেইজিংয়ের এই সিএমবিসি করিডোরের পেছনের মূল ভূকৌশলগত উদ্দেশ্য হলো তাদের বিখ্যাত ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বা মালাক্কা প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সংকট থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া। কোনো সম্ভাব্য যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় মার্কিন নৌবাহিনী যদি কৌশলগত মালাক্কা প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের জ্বালানি ও তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এক ধাক্কায় অচল হয়ে পড়তে পারে। এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে বেইজিংয়ের জন্য সিএমবিসি এক বড় উদ্ধারকর্তা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত এক্সেস বা প্রবেশাধিকার পেয়ে যাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ অর্থনৈতিক করিডোর নয়, বরং মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে একই সুতোয় বেঁধে বেইজিং মূলত এই অঞ্চলে তাদের বহুল আলোচিত ‘মুক্তার মালা’ বা স্ট্রিং অব পার্লস নীতিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে চাইছে। কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে চলে আসবে ভারত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ উপকূল।

চীনের এই আগ্রাসী ও দূরপ্রসারী চালের বিপরীতে জাপানও বসে নেই, তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা চাল দিয়েছে। বেইজিংয়ের জুন মাসের প্রস্তাবের মোক্ষম জবাব দিতেই জুলাইয়ের শুরুতে জাইকা প্রধানের এই জরুরি ঢাকা সফর অনুষ্ঠিত হয়। জাপানের এই বিশেষ কৌশলের নাম ‘বিগবি’ বা বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট, যার মূল হৃদপিণ্ড হিসেবে কাজ করছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। টোকিও এখানে অত্যন্ত মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে। মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে তারা মূলত বঙ্গোপসাগরের বুকে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ আধিপত্য ও প্রভাবকে শক্ত হাতে রুখে দিতে চায়। এর পাশাপাশি জাপানের এই প্রকল্পের সাথে একটি শক্তিশালী ভারত কানেকশন বা ভারতীয় সংযোগ জড়িত রয়েছে। এই করিডোরটি কেবল বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে শেষ হয়ে যায়নি, বরং মাতারবাড়ী বন্দরকে ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ল্যান্ডলকড বা ভূমিসীমানায় অবরুদ্ধ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার খুলে দিচ্ছে জাপান। টোকিওর এই স্বার্থটি সম্পূর্ণ ভূকৌশলগত, কারণ তারা কোনোভাবেই বেইজিংকে বঙ্গোপসাগরের একক নিয়ন্ত্রণ বা চাবিকাঠি নিজেদের হাতে তুলে নিতে দেবে না। আর এই কারণেই মাতারবাড়ীর কাজের গতি বাড়াতে তারা নজিরবিহীন তাগিদ দিচ্ছে।

জাপানের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে রয়েছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষ বা কোয়াড অ্যালায়েন্সের পরোক্ষ ও অন্ধ সমর্থন। নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারত ও আমেরিকা সরাসরি মাঠে না নেমে জাইকার এই প্রজেক্টের পেছনে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। তারা খুব ভালো করেই জানে যে বাংলাদেশে যদি তারা সরাসরি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই রুখতে যায়, তবে ঢাকার সাথে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিদ্যমান ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই কৌশলগত কারণেই ভারতের নিরাপত্তার জন্য মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কোনো হুমকি নয়, বরং এটি তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জন্য বাণিজ্যের এক নতুন লাইফলাইন। চীনকে সামুদ্রিক বলয়ে রুখতে ভারতের চাই একজন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক পার্টনার, যা জাপান নিখুঁতভাবে পূরণ করছে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মূল কথাই হলো এই এশীয় অঞ্চলে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ও একক আধিপত্যের বিস্তার ভেঙে দেওয়া। ফলে জাপান যখন মাতারবাড়ী বা বিগবি প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, ওয়াশিংটন তখন ব্যাকসিটে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ বেইজিংয়ের সিএমবিসি করিডোরকে কাউন্টার করার এর চেয়ে ভালো কোনো বেসামরিক বা অর্থনৈতিক অস্ত্র তাদের হাতে নেই।

এই দুই পরাক্রমশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিলিয়ন ডলারের টানাটানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে মূল খেলোয়াড় তথা বাংলাদেশের কৌশল এখন পর্যন্ত অত্যন্ত পেশাদার, শীতল ও নিখুঁত হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা মূলত চীনের কুনমিং টু চট্টগ্রাম কানেক্টিভিটির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো নিজেদের পক্ষে নিতে চায়, কিন্তু একই সাথে মিয়ানমারের ভেতরের বর্তমান চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং চীনের বহুল আলোচিত ঋণের ফাঁদের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বেইজিংয়ের এই বিশাল প্রস্তাবকে ঢাকা যেমন সরাসরি রিজেক্ট বা প্রত্যাখ্যান করেনি, ঠিক তেমনি কোনো প্রকার অন্ধ লোভে পড়ে এখনই তা লুফেও নেয়নি। অন্যদিকে জাইকার প্রকল্পগুলোকে ঢাকা তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা সেফ হেভেন হিসেবে বিবেচনা করছে, কারণ জাপানকে মেনে নিলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর হয় এবং আমেরিকার সাথেও কোনো ধরণের কূটনৈতিক বৈরিতা তৈরি হয় না। তবে দুই এশীয় জায়েন্টের মাঝখানে এই দীর্ঘমেয়াদী নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য বজায় রাখাটা দিন দিন আরও বেশি কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

চলতি বছরের জুন মাসে বেইজিং অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশের সাথে আর কেবল সাধারণ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে থাকতে রাজি নয়, বরং তারা একটি শক্তিশালী স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত করিডোর চায়। এর বিপরীতে টোকিও জুলাই মাসে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে এই প্রকল্পগুলো নিয়ে দেরি করার মতো সময় আর তাদের হাতে নেই। বর্তমান বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগর আর কোনো সাধারণ বা শান্ত জলরাশি নয়, এটি এখন গ্লোবাল সুপারপাওয়ার বা বিশ্ব পরাশক্তিদের ভূরাজনৈতিক হাইওয়েতে পরিণত হয়েছে। চীন তার সিএমবিসি প্রজেক্ট দিয়ে এই হাইওয়ের একক দখল নিতে চায়, আর জাপান-ভারত-মার্কিন অক্ষ মাতারবাড়ী দিয়ে সেখানে একটি শক্তিশালী স্পীড ব্রেকার বসাতে চাইছে। তবে ঢাকা এখন পর্যন্ত দুই পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফায়দা তোলার নীতিতে বেশ সফলভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই জুন ও জুলাই মাসের কূটনৈতিক চাপ এটাই প্রমাণ করছে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এখন দেখার বিষয় হলো, ঢাকা আগামী দিনে তার সমুদ্রবন্দরগুলোকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ইঞ্জিন বানাতে পারে, নাকি পরাশক্তিদের পাতা ভূরাজনৈতিক ফাঁদে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category