বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বহুমুখীকরণের পরিকল্পনায় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নতুন সিদ্ধান্ত। নেপাল থেকে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিল ঢাকা, কিন্তু ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) এই বাড়তি বিদ্যুৎ প্রবাহের অনুমোদন প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা সীমাবদ্ধ হওয়ায় এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পরিবহন করা আপাতত অসম্ভব। ফলে নেপাল বর্তমানে শুধুমাত্র পূর্বনির্ধারিত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎই বাংলাদেশে রপ্তানি করতে পারবে।
বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারকদের মতে, ভারতের সরকারি সংস্থা এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিপিএন) নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটিকে (এনইএ) জানিয়েছে যে, ১,০০০ মেগাওয়াটের ভারত-বাংলাদেশ ক্রস-বর্ডার ট্রান্সমিশন লাইনটি দিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ পাঠানোর সুযোগ নেই। এই সংকট নিরসনে এখন নেপাল ও ভারতের আসন্ন জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটি (জেএসসি) এবং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন পড়বে। এছাড়া, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন করে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিরও প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক জেএসসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৩ অক্টোবর এনইএ, বিপিডিবি এবং এনভিপিএন-এর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়, যার মাধ্যমে প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির অনুমতি পায়। ওই চুক্তির অংশ হিসেবেই গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো নেপাল থেকে ১২ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। সেই বিদ্যুৎ ধলকেবার-মুজাফফরপুর ৪০০ কেভি এবং বহরমপুর-ভেড়ামারা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে পৌঁছায়।
এই বাণিজ্যের ধারাবাহিকতায় গত ২৭ নভেম্বর ২০২৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জেএসসি বৈঠকে বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিমাণ ২০ মেগাওয়াট বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে করে মোট রপ্তানির পরিমাণ ৬০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই নতুন জটিলতার কারণে নেপালের বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক থারকা বাহাদুর থাপা জানিয়েছেন, এবার কোনোভাবেই ৪০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাঠানো সম্ভব হবে না। অথচ এই বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া এনভিপিএন-এর মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক আগেই শুরু করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত সঞ্চালন সক্ষমতার দোহাই দিয়ে আটকে দেওয়া হলো।
বিদ্যুৎ বাণিজ্যের এই সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি কারিগরি জটিলতাও একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হচ্ছে, তা আসছে ত্রিশূলী ও চিলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। এই প্রকল্পগুলো ভারতের বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য আগেই প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য একই প্রকল্পের অধীনে নতুন করে ভারতের কাছ থেকে আলাদা ছাড়পত্রের প্রয়োজন পড়বে। এটি এক দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে, যা বিদ্যুৎ আমদানির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ভারতের সাথে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের আর্থিক নিষ্পত্তির বিষয়টি সাধারণত ভারতীয় রুপিতে হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে এই বিদ্যুৎ বাণিজ্যের লেনদেন মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়, যা উভয় দেশের জন্য একটি ভিন্নধর্মী ও জটিল অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। এই আর্থিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সঞ্চালন ব্যবস্থা। কিন্তু ভারতের সীমান্ত দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এই ‘সঞ্চালন সক্ষমতা স্বল্পতা’র অজুহাত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকে কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড তৈরির যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেখানে এই ধরনের সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। বাংলাদেশ যেখানে তার বিদ্যুৎ খাতের চাহিদাকে সামলাতে বিভিন্ন উৎস খুঁজছে, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জাতীয় কারিগরি বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা উত্তরণ করা ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতা পূর্ণতা পাবে না। সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং দেশগুলোর মধ্যে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী সমন্বয়ের প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, নেপাল থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আনার বিষয়টি এখন পুরোপুরি নতুন করে আলোচনার টেবিলে ফিরে গেছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের মধ্যেকার কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনার মাধ্যমেই কেবল এই ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বাধা দূর করা সম্ভব। তবে এটি কেবল ২০ মেগাওয়াটের বিষয় নয়, বরং এটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি তার ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ এভাবে নেপাল থেকে আনতে চায়, তবে সঞ্চালন লাইনের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা এখন তাদের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আসন্ন বৈঠকগুলোতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে উত্তর থেকে আসা এই বিদ্যুতের নতুন ভবিষ্যৎ। সব মিলিয়ে, সবার নজর এখন নেপাল-ভারত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড