আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়া কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান—জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দিক থেকে এই দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের ব্যাপক সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এই প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কেবল বেমানানই নয়, বরং অবিশ্বাস্য। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার দাবি করা হলেও অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত চিত্রটি এর চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার কম হতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই পরিসংখ্যানকে অতিরঞ্জিত করা হলো? উত্তরটি স্পষ্ট—উন্নয়নের একটি কৃত্রিম বয়ান তৈরি করে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণের পাহাড় গড়া।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ২৪ কোটি মানুষের দেশ নাইজেরিয়ার জিডিপি বর্তমানে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে সাড়ে ২৫ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তানের জিডিপি ৩৪০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। অথচ সমপরিমাণ বৈদেশিক বাণিজ্য এবং মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারে এগিয়ে থেকেও বাংলাদেশের জিডিপি দেখানো হচ্ছে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেসের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে অর্থনৈতিক উৎপাদনের যে হিসাব বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তা চীন বা ভারতের চেয়েও ৫০-৬০ শতাংশ বেশি, যা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
জিডিপির আকার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘ডেট-টু-জিডিপি রেশিও’ বা ঋণ-জিডিপি অনুপাতকে সহনীয় দেখানো। সরকারি হিসাবে এই অনুপাত ৩৮.৬১ শতাংশ হলেও যদি জিডিপির আকার প্রকৃত ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়, তবে এই অনুপাত ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
২০১০ সালে ঋণ ছিল: ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা।
২০২৬ সালে ঋণ দাঁড়িয়েছে: ২৩.৫ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ, জিডিপির কৃত্রিম বিশালত্ব দেখিয়ে সরকার ক্রমাগত ঋণ নিয়ে গেছে, যা এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘চেঞ্জ অব ফ্যাব্রিক’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ দাবি করা হলেও প্রকৃত হার ছিল মাত্র ৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানকে ‘সি’ (C) রেটিং দিয়েছে। আইএমএফ-এর মতে, বাংলাদেশের জিডিপি গণনার পদ্ধতি মান্ধাতা আমলের এবং এখানে তথ্যের ব্যাপক কারচুপি ও বিলম্ব লক্ষ্য করা গেছে।
মাথাপিছু জিডিপি সরকারি হিসাবে ২,৬৭৫ ডলার দাবি করা হলেও প্রকৃত হিসাবে তা ২,০৪০ ডলারে নেমে আসতে পারে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ৪৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ার যে অবকাঠামো এবং মাথাপিছু আয়, তার তুলনায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারের দাবিদার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ অত্যন্ত করুণ। বিবিএস মূল্যস্ফীতি কমার দাবি করলেও বাজারের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জিডিপি (সরকারি দাবি)
৪৫৬ বিলিয়ন ডলার
জিডিপি (সম্ভাব্য প্রকৃত আকার)
৩০০ – ৩৫০ বিলিয়ন ডলার
ঋণ-জিডিপি অনুপাত (প্রকৃত)
৫০% – ৫৫% (সম্ভাব্য)
মাথাপিছু জিডিপি (প্রকৃত)
প্রায় ২,০৪০ ডলার