বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বা আইসিটি খাতের বাজার দিন দিন অভাবনীয় দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্প উৎপাদনসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এখন এক অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশজুড়ে ক্লাউড কম্পিউটিং, বিশাল ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মতো আধুনিক প্রযুক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে দেশের তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন স্পর্শকাতর খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ভারতের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া শক্ত অবস্থান ও আধিপত্য বজায় ছিল। তবে দৃশ্যপট এখন দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া ব্যবসা করা চীনা কোম্পানিগুলো এখন তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং আর্থিক প্রযুক্তির মতো সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আর এই ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের বাস্তবতায় বাংলাদেশের আইসিটি বাজারকে কেন্দ্র করে বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যকার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা লাভ করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিফায়েড মার্কেট রিসার্চের সাম্প্রতিক এক বিশদ পরিসংখ্যান ও মূল্যায়নে বাংলাদেশের প্রযুক্তি বাজারের এই বিশাল সম্ভাবনার চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বা আইসিটি বাজারের মোট আকার ছিল প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। তবে এই বৃদ্ধির ধারা এখানেই থেমে থাকছে না। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২০৩২ সাল নাগাদ এই দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের আকার আড়াই গুণ বেড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময়কালে এই প্রযুক্তি বাজারটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে গড়ে প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ। দেশের এই সুবিশাল আইসিটি বাজারটি মূলত হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, টেলিযোগাযোগ এবং ক্লাউড প্রযুক্তি—এই প্রধান চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সামগ্রিক বাজারে টেলিযোগাযোগ খাতের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি সেবার অংশ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একই বছরে দেশের ব্যাংক, আর্থিক সেবা ও বীমা খাত একাই দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের প্রায় ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বিশাল চাহিদা তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক প্রযুক্তি এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কারণে এই খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আর্থিক খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের ছোঁয়া যত বেশি লাগছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও ঠিক ততটাই বিস্তৃত ও অপরিহার্য হয়ে উঠছে। এর ফলে টেলিযোগাযোগ খাতটি আকারের দিক থেকে সবচেয়ে বড় হলেও, বর্তমানে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা খাত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের অন্যতম প্রধান ও দ্রুত বর্ধনশীল প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই মূলত মার্কিন, ইউরোপীয়, ভারতীয় ও দেশীয় বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার বা ‘সলিউশন’ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মধ্যে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টেমেনোসের ‘টি২৪’, মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ওরাকলের ‘ফ্লেক্সকিউব’ এবং ভারতের ইনফোসিসের ‘ফিনাকল’-এর মতো অত্যন্ত পরিচিত সলিউশনগুলোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় সফটওয়্যারও সফলতার সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে একটি আধুনিক ব্যাংকের প্রযুক্তি ব্যবস্থা শুধু এর কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে বিশাল তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ, শক্তিশালী সার্ভার, প্রসেসর, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা স্টোরেজ, সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক এবং যেকোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের সময় বিকল্পভাবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা চালু রাখার জন্য শক্তিশালী ব্যাকআপ অবকাঠামো। এসব অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবকাঠামোগত ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা ও বিদেশী প্রযুক্তির একচেটিয়া ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ওরাকল, আইবিএম, ইনটেল, ডেল, এইচপিই এবং সিসকোর মতো বিশ্বখ্যাত পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দেশের ব্যাংকিং অবকাঠামোর বিভিন্ন স্তরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের পুরো প্রযুক্তি ব্যবস্থা সাধারণত একক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার এক প্রতিষ্ঠানের হলেও সার্ভার, প্রসেসর, তথ্যভাণ্ডার, নেটওয়ার্ক বা তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্য প্রতিষ্ঠানের হতে পারে। ঠিক এই অত্যন্ত লাভজনক ও কৌশলগত জায়গাতেই এখন চীনা কোম্পানিগুলো পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এক অসম প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে। তারা এখন আর নিজেদের শুধু ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মধ্যে আটকে না রেখে সার্ভার, তথ্য সংরক্ষণ, ডেটা সেন্টার, বেসরকারি ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এর ফলে প্রতিযোগিতা আর শুধু টেলিযোগাযোগের অ্যান্টেনা, রাউটার বা ট্রান্সমিশন সরঞ্জামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন ক্রমশ পুরো দেশের প্রযুক্তি অবকাঠামোকে ঘিরেই বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশের প্রযুক্তি খাতের এই রূপান্তর প্রসঙ্গে থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক বাসব প্রসাদ বাগচী গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, দেশের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো পর্যন্ত সাধারণভাবে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার বেশ সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যার হিসেবে ওরাকল ফ্লেক্সকিউব, টেমেনোস টি২৪, ইনফোসিস ফিনাকল এবং টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমাধান ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর পাশাপাশি সার্ভার, প্রসেসর, তথ্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় আইবিএম, ইনটেল, ডেল, এইচপি ও সিসকোর মতো প্রখ্যাত পশ্চিমা প্রযুক্তিরও দীর্ঘদিনের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। তবে টেলিযোগাযোগ খাতে চীনা প্রযুক্তির একচেটিয়া ব্যবহারের কথা স্বীকার করে তিনি আরও জানান যে, হুয়াওয়ের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ও নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি দেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন তারা নিজেদের শুধু টেলিকম খাতেই সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, ব্যাংকিং অবকাঠামো এবং অন্যান্য বড় মাপের এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তিতেও অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে যুক্ত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মজার বিষয় হলো, চীনা প্রযুক্তিকে এখন আর কেবল সস্তা বা সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে হেলাফেলা করা হচ্ছে না; বরং সক্ষমতা, স্থায়িত্ব ও আধুনিকতার দিক থেকেও দেশীয় অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এখন তাদের প্রযুক্তিগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছে। হুয়াওয়ের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ইতোমধ্যেই তাদের সমন্বিত ডেটা সেন্টার, ভার্চুয়ালাইজেশন ও উন্নত ফ্ল্যাশ তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব চীনা প্রযুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজারের লেনদেন, নিষ্পত্তি, সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তথ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিচালন ব্যয় কমানোর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, গত কয়েক বছরে দেশের উদীয়মান বাজারে বেশ কিছু নতুন চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত নীরবে প্রবেশ করেছে। তাদের মতে, এসব চীনা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার মান যেমন পূর্বের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে, তেমনি এদের দামও পশ্চিমা পণ্যের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশ প্রতিযোগিতামূলক। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো কোর ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সরব হলে ব্যাংকের সফটওয়্যার ও সার্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামোর ব্যয় বহুল অংশে কমার একটি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এই আগ্রাসী বিস্তারের ক্ষেত্রে সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনায় উঠে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে সরাসরি কোনো চীনা প্রযুক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট চীনা কোম্পানির ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। তবে এই চুক্তির পরতে পরতে জাতীয় নিরাপত্তায় সংবেদনশীল প্রযুক্তি, কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত কঠিন কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বা সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যেসব প্রযুক্তি তাদের এক্সপোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা রপ্তানি প্রশাসন বিধির আওতাভুক্ত, সেগুলোর অনুমোদনহীন পুনঃরপ্তানি বা দেশের ভেতরে অন্য কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তর ঠেকাতেও বাংলাদেশকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। চুক্তির শেষ অংশে আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত শর্ত রাখা হয়েছে। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ যেসব দেশকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করবে, সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে সেসব দেশের সফটওয়্যারের নকশা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও সরবরাহে সম্পৃক্ততা সীমিত করার জন্য বাংলাদেশ আপ্রাণ চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে এ ধরনের স্পর্শকাতর সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর কথাও চুক্তিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির এই ভূরাজনৈতিক শর্তগুলো চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের বিশাল বাজারে অবাধে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগামীতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও বাধা হয়ে উঠতে পারে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে হুয়াওয়েসহ চীনের একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে সেই ২০১৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের কালো তালিকা বা ‘এনটিটি লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি প্রশাসন বিধির আওতাধীন নির্দিষ্ট কোনো পণ্য, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি হুয়াওয়েকে সরবরাহ করতে হলে সাধারণত বিশেষ লাইসেন্স বা পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনটি কতটা কঠোর, তার একটি বড় উদাহরণ হলো ২০২৬ সালের জুনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। হুয়াওয়েকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া নিয়ন্ত্রিত সেন্সর ও সফটওয়্যার সরবরাহের অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ জার্মান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বশকে ৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বিশাল অঙ্কের জরিমানা করেছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের জাতীয় নিরাপত্তাজনিত নিষিদ্ধ তালিকাতেও হুয়াওয়ে ও জেডটিইর নাম এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে এই নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ব্যাংক খাতে প্রযুক্তি বা পণ্যের মূল্য সুবিধার চেয়েও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয় সবসময় উন্মুক্ত থাকা উচিত বলে নিজস্ব মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র বলেন, বর্তমান বিশ্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক ও ব্যবসায়িকভাবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত ও অবাধ থাকলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ভোক্তাই প্রযুক্তিগতভাবে উপকৃত হন। তিনি আরও বলেন যে, আমরা মূলত একটি উন্মুক্ত বিশ্ব বা মুক্তবাজার অর্থনীতি চাই। যদিও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি মোটেও সে জায়গায় নেই। এখানে বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর নানা ধরনের স্যাংশন ও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। আরিফ হোসেন খান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ আমাদের অন্য যেসব বড় ও কৌশলগত বাণিজ্য অংশীদার রয়েছে, তাদের ব্ল্যাক লিস্টেড বা স্যাংশনভুক্ত কোনো দেশ বা কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তিপণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমরা বরাবরই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকি। এ বিষয়ে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। স্যাংশনভুক্ত কিংবা আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ আছে এমন যেকোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক প্রস্তাব যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয় হোক না কেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেটি গ্রহণ করতে পারি না।
সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক এই নানা মেরুকরণের কারণে দেশের আইসিটি বাজারে সামনের দিনগুলোতে এক ধরনের প্রবল দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। একদিকে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা বাংলাদেশের বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত ও সুসংহত করতে চীনা কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, আর্থিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয় তাদের বিস্তার আরও বাড়াতে চাইবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির কারণে চীনা প্রযুক্তি কেনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা এর ভেতরের কোনো ক্ষুদ্র উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ তালিকায় আছে কিনা—এসব জটিল আইনি বিষয়ও ক্রয় সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের প্রযুক্তিসেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দেশে কোনো অসুবিধা তৈরি হবে—এমন কোনো বিষয় এখনো সরকারি নজরে আসেনি। তবে ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক কারণে এমন কোনো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার অবশ্যই তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখবে।
আইসিটি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা নির্দিষ্ট প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর রাষ্ট্রের অতিনির্ভরতা তৈরি হলে সফটওয়্যার হালনাগাদ, খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি, লাইসেন্স নবায়ন, কারিগরি সহায়তা প্রাপ্তি কিংবা আকস্মিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে দেশের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দেশের ডেটা ভৌগোলিকভাবে দেশের ভেতরে থাকলেও সার্ভার, ক্লাউড, মূল সফটওয়্যার বা রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ন্ত্রণ যদি বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত থাকে, তবে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সেই দেশের হাতে আর থাকে না। এ কারণে নিজস্ব স্থানীয় ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালনা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দুর্যোগকালীন দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং দেশের প্রয়োজনে এক প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অন্য প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের কারিগরি সক্ষমতাও দেশে জরুরি ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে বিদেশী সরবরাহকারীর মূল্যায়নের ওপর পুরোপুরি অন্ধের মতো নির্ভর না করে, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং নিয়মিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
আগামী দিনে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার। বিডিজবস ডটকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর মনে করেন, আগামী দিনগুলোয় দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বহুগুণ বাড়বে এবং তখন কোন দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে বা বাণিজ্য চুক্তির কোনো শর্ত বাধা তৈরি করবে কিনা—এসব ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে আসতে পারে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাধীনতার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজন ও ঝুঁকি বিবেচনা করে উন্মুক্ত বাজার থেকে প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। পরিশেষে, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে অনিবার্যভাবেই পড়বে। তবে এই ভূরাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের সংবেদনশীল ও কৌশলগত ডেটার সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ডেটা কোথায় সংরক্ষিত থাকবে, কে বা কারা সেখানে প্রবেশাধিকার পাবে এবং এর ওপর দেশের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও স্বাধীন সক্ষমতা থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা