বাংলাদেশের ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংক ৪৫ কোটি ডলারের বড় আকারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় মূলত ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অব এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরস সম্প্রতি এই ঋণ অনুমোদন করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নানা ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে ঋণ বিতরণের প্রবণতা খাতটিকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর গড়ের (৭ দশমিক ৯ শতাংশ) তুলনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত (Capital-to-Risk-Weighted Assets Ratio) ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, দেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এই খাতটি কতটা চাপের মুখে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নপূরণ করতে হলে একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাতের কোনো বিকল্প নেই। অথচ দেশের মোট আর্থিক সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ দখল করে থাকা ব্যাংকিং খাতটি বর্তমানে তীব্র সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকট উত্তরণে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আমানত সুরক্ষা তহবিলকে শক্তিশালী করা। তহবিলের মূলধন বাড়ানোর মাধ্যমে ছোট আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখা হবে, যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় থাকে।
প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই আধুনিকায়ন কার্যক্রমের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নিবিড়ভাবে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মনিটর করতে পারবে এবং তথ্যনির্ভর ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। মূলত, আর্থিক খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এই প্রকল্প ব্যাংক রেজল্যুশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সংস্কারের পথ প্রশস্ত করবে। এতে সংকটকালীন জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো তৈরি এবং ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন কৌশল প্রণয়নের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এই উদ্যোগটি একক কোনো প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি আইএমএফ (IMF) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (ADB) অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ। বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ ও এই প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তোশিয়াকি ওনো জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চাপ সামলানোর জন্য কর্তৃপক্ষের দক্ষতা বাড়ানো এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করাই এই অর্থায়নের মূল লক্ষ্য। এটি একটি সমন্বিত পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে, যাতে করে ভবিষ্যতের যেকোনো আর্থিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা আরও বেশি সক্ষম ও সচেতন হয়ে ওঠেন।
ব্যাংকিং খাতের এই সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রয়োজন, তা এই প্রকল্পের মাধ্যমে অনেকটা পূরণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনা দূর করে সেগুলোকে দক্ষ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে এই ৪৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন কেবল একটি আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং এটি সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নির্ভর করছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। অতীতেও ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের নামে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রকল্পটির প্রতিটি ধাপের যথাযথ তদারকি জরুরি। আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের নীতিমালার কঠোর প্রয়োগই পারে খাতটিকে এই দুঃসময় থেকে রক্ষা করতে। বিশ্বব্যাংকের দেওয়া এই প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক অনুদান যদি সঠিক পথে ব্যয় করা হয়, তবে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকিং খাতের আমূল সংস্কারে মনোযোগী হয়, তবেই দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু করতে হলে শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত অনিবার্য। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি মাইলফলক হতে পারে, তবে এর সফল প্রয়োগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। খাতটিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি হ্রাস করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য।
তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড