• শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০ অপরাহ্ন

বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে ৮ অক্টোবর ইনভেস্ট বাংলাদেশের সঙ্গে একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে| বন্দর ব্যবহারকারী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং খোদ বন্দর শ্রমিকদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখেই সরকার এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে এগিয়ে গেছে| ইনভেস্ট বাংলাদেশ এই চুক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, নতুন বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচন এবং বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি ‘যুগান্তকারী মাইলফলক’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে| এটি অনস্বীকার্য যে, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানের কার্গো হ্যান্ডলিং এবং পরিচালনাগত দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে| কিন্তু সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির অর্থ এই হতে পারে না যে, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত প্রধান সমুদ্রবন্দরের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ঢালাওভাবে বিদেশি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে তুলে দিতে হবে|

বিগত বছরগুলোর নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো দৃশ্যমান প্রয়াস ছাড়াই কৌশলগত সমুদ্র অবকাঠামো বিদেশি অপারেটরদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে| সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য পরিচালনা করছে| অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘ ৩৩ বছরের জন্য তুলে দেওয়া হয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের হাতে| এর সঙ্গে নতুন করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, সরকার নিজস্ব জনবল তৈরি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পথ পরিহার করে অতিমাত্রায় বিদেশিনির্ভরতার এক ঝুঁকিপূর্ণ মডেল বেছে নিয়েছে|

দক্ষতা বৃদ্ধি ও কারিগরি উন্নয়ন যদি এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হতো, তবে চুক্তির রূপরেখা এমনভাবে তৈরি করা যেত যাতে নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের পুরো বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিজ হাতে তুলে নেওয়ার উপযোগী করা যায়| কিন্তু একের পর এক প্রধান টার্মিনাল দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি শক্তির হাতে চলে যাওয়ায় দেশের ভবিষ্যৎ স্বয়ংসম্পূর্ণতার সম্ভাবনা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে| এই নীতি বাংলাদেশের জন্য অন্তত তিনটি বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে| প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রগ্রেসিভ ও স্ল্যাবভিত্তিক রয়্যালটি কাঠামোর আওতায় প্রতি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ শতকরা ৪০ থেকে ৬৭ ভাগ পর্যন্ত যে বিপুল নিশ্চিত রাজস্ব পেয়ে আসছিল, নতুন চুক্তির শর্তে সেই আয়ের বড় একটি অংশ হাতছাড়া হয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি হতে পারে| দ্বিতীয়ত, নিজস্ব উদ্যোগে কনটেইনার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার যে সুযোগ ছিল, তা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে| আর তৃতীয়ত, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও দীর্ঘমেয়াদে চরম উদ্বেগের কারণ|

যে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি এককভাবে বিগত ২০২৫ সালে দেশের সমুদ্রবাণিজ্যের মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ সফলতার সঙ্গে খালাস করেছে, সেই লাভজনক টার্মিনালটি নিয়ে এমন একটি অস্বচ্ছ চুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না| এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ লেবার ওয়েলফেয়ার ফেডারেশন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এবং বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ রাজপথে নেমে এসেছে| প্রায় ২০ হাজার বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীর রুটি-রুজির নিরাপত্তা, কাজের অধিকার, চুক্তির আইনি ও আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং পরিচালনাগত ক্ষমতার শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশের যে দাবি তারা তুলেছেন, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অত্যন্ত ন্যায্য ও মৌলিক অধিকার|

যে চুক্তিটির বীজ আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত শাসনকালে রোপিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নানা জটিলতায় থমকে ছিল, সেই পুরোনো অস্বচ্ছ উদ্যোগকে নতুন করে কার্যকর করা অত্যন্ত হতাশাজনক| বিশেষ করে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় সোচ্চার থাকা কোনো রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে, তখন তাদের কাছ থেকে জাতীয় সম্পদের সুরক্ষায় আরও সতর্ক ও দূরদর্শী অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল| বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি অনুযায়ী, অবিলম্বে এই চুক্তির সমস্ত ধারা উন্মুক্ত করে এর একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও তুলনামূলক আর্থিক মূল্যায়ন জনগণের সামনে উপস্থাপন করা আবশ্যক| বন্দর ব্যবহারকারী, বিশেষজ্ঞ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত প্রধান এই সমুদ্র সম্পদ নিয়ে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কখনোই জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category